সম্পাদকীয়ঃ নতুন যাত্রা, কিন্তু বিষাদময়।

105

অতিমারি করোনাভাইরাসের থাবায় গোটা বিশ্ব বিপর্যস্ত। প্রতিদিন সংক্রমণ বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে। এই বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। মার্চ থেকে প্রায় স্থবির হয়ে গেছে জীবনযাত্রা। স্বাভাবিকভাবে ঐক্য পরিষদের মাসিক প্রকাশনা ‘পরিষদ বার্তা’ মার্চ মাস থেকে প্রকাশিত হতে পারেনি। এর ফলে যোগাযোগ ও চিন্তা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এক বিরাট ব্যবধান তৈরি হয়। এই প্রেক্ষিতে ঐক্য পরিষদের প্রকাশনা ধারার সঙ্গে যুক্ত নেতৃবৃন্দ ভার্চুয়ালি আলোচনায় মিলিত হয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ‘পরিষদ বার্তা’ প্রিন্ট ভার্সান সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে অনলাইন প্রকাশনার সিদ্ধান্ত নেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা যখন অনলাইনের নতুন যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনই খবর আসে আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও নেতা মেজর জেনারেল (অব.) চিত্তরঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) বীরউত্তম আর নেই। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক সি আর দত্তের অমৃতলোকের ডাক এসে গেছে। এক নদী রক্ত, ত্রিশ লাখ প্রাণ, চার লাখেরও বেশি নারীর সম্ভ্রম-আত্মদান ও ধ্বংসলীলার বিনিময়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মুক্তিযুদ্ধের চার মূল নীতির ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়ন এবং ধ্বংসস্তুপ থেকে দেশ গড়ে তোলার নতুন যুদ্ধ শুরু করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রে জাতির জনক সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশ আবার পাকিস্তানের পথে ফিরতে শুরু করে। জাতিকে গ্রাস করে অন্ধকার। সংবিধান পরিবর্তন করা হয়, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করা হয় ও জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়, সাম্প্রদায়িক নির্যাতন নিপীড়ন ব্যাপক আকার ধারণ করে, শত্রু সম্পত্তি আইনকে ব্যবহার করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশান্তরিত করা হয় পাকিস্তান আমলের মতোই। মানবাধিকার হয় লংঘিত। এরই ধারাবাহিকতায় সংবিধানে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয় রাষ্ট্রধর্ম। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা পরিণত হয় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। হতাশ হয়ে পড়ে সংখ্যালঘুরা। যে দেশের স্বাধীনতায় ধর্মনির্বিশেষে সবাই রক্ত দিয়েছে সে দেশে তারা ব্রাত্য। ক্ষোভ ও হতাশা গ্রাস করে তাদের।
এই পরিস্থিতিতে আলোর মশাল হাতে যাঁরা জাগরণের নতুন মন্ত্র নিয়ে সামনে এগিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীরউত্তম ছিলেন তাঁদের অন্যতম। যাঁর বজ্রকন্ঠে ধ্বনিত হয়, ধর্মীয় রাষ্ট্র করার জন্যে মুক্তিযুদ্ধ করিনি। শত্রু সম্পত্তি আইন প্রতিরোধ পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ধারাবাহিকতায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ঐক্যবদ্ধ করে সংগঠিত হয় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। যাঁরা মশাল হাতে সামনে ছিলেন একে একে অনেকে প্রয়াত হয়েছেন। বাতিঘর হিসেবে সামনে ছিলেন সি আর দত্ত বীরউত্তম। তিনিও চলে গেলেন। আমাদের বাণী রুদ্ধ, শোকপ্রকাশের ভাষা নেই। তবে যে মশাল প্রজ্জ্বলিত হয়েছে আমরা তাঁর, তাঁদের উত্তরসুরিদের তা এগিয়ে নিয়ে যেতেই হবে। আমরা বিশ্বাস করি, আলোর মশাল বহন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে প্রয়াত মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীর প্রতি, আমাদের বাতিঘরের প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদন। আমরা আরও বিশ্বাস করি, সি আর দত্তদের কখনো মৃত্যু হয় না। বিশ্বজনীন নিয়মে তাঁদের শারীরিক মৃত্যু ঘটে, কিন্তু যে শক্তি আমাদের মধ্যে সঞ্জীবিত হয়েছে তাঁদের আলোর স্পর্শে তা স্তব্ধ করে দেওয়ার সাধ্য, ক্ষমতা কারো নেই।
সি আর দত্ত প্রতিনিয়ত আমাদের মধ্যে থেকে গর্জে উঠবেন, ধর্মীয় রাষ্ট্র করার জন্যে মুক্তিযুদ্ধ করিনি।
‘পরিষদ বার্তা’ অনলাইনে প্রকাশের শুরুতে বিষাদ আমাদের গ্রাস করেছে, কিন্তু অনিবার্য সত্যকে মেনে নিয়ে আমরা এই বিশ্বাস নিয়েই এগুতে চাই, যে পতাকা উত্তোলিত হয়েছে তা আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবোই নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের স্বার্থে। আমাদের অন্তরে লালিত হবে সেই বজ্রবাণী।