বঙ্গীয় শব্দকোষ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

42

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বঙ্গীয় শব্দকোষের নাম তো সবাই শুনেছেন। কিন্তু জানেন কি, কী ভাবে তৈরি হল এই বিপুল শব্দভান্ডার ? কেমন মানুষই বা ছিলেন এই হরিচরণ? কোনও সহকারী ছাড়াই একক পরিশ্রমেই যিনি তৈরি করে ফেলেছিলেন এই শব্দকোষ। যে কাজ করতে গিয়ে তিনি উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন তাঁর জীবনের প্রায় চল্লিশ বছর। হারিয়েছিলেন তাঁর দৃষ্টিশক্তিও। নতুন শব্দ খোঁজা ছাড়া যাঁর জীবনে ছিল না আর কোনও লক্ষ্য। তবু আজও তিনি বাঙালি সমাজে উপেক্ষিত।

তাঁর জন্ম ২৩ জুন, ১৮৬৭ সালে। আর্থিক স্বাচ্ছল্য তাঁর জীবনে কোনও দিনই ছিল না। স্কুলে ভর্তির টাকা নেই, বেতন দেওয়ার টাকা নেই। এই সবের মধ্যেই কেটেছিল তাঁর শৈশব। তখন তাঁর বয়স পনেরো কী ষোল। যদুনাথ চট্টোপাধ্যায় খবর আনলেন বাবুদের বাড়ি ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ নাটক হবে। অভিনয় করবেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে দেখার ইচ্ছায় যেন আর স্থির থাকতে পারলেন না তিনি। ছুটে গেছিলেন পালা দেখতে। দস্যুবেশী রবীন্দ্রনাথ ও সর্দারের চরিত্রে অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীর অভিনয় তিনি সারা জীবন মনে রেখেছিলেন।

পিতার মৃত্যুর পর আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। যদুনাথেরই উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের জমিদারির অন্তর্গত পতিসরের কাছারিতে তাঁর চাকরি হয়। একদিন জমিদারির কাজ পরিদর্শনে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। তরুণ হরিচরণকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘দিনে তো সেরেস্তায় কাজ কর, রাত্রিতে কী কর?’ হরিচরণের উত্তর, ‘সন্ধ্যার পর সংস্কৃত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি। একখানি বইয়ের পান্ডুলিপি দেখে প্রেসের কপি-পান্ডুলিপি প্রস্তুত করি।’ শুনে রবীন্দ্রনাথ চমকে গেলেন। দেখতে চাইলেন সেই পান্ডুলিপি। হরিচরণ ছুটে নিয়ে এলেন সেই পান্ডুলিপি। সেটি হাতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বাক্যহারা হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর সেটি ফেরত দিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলেন।

দিন কয়েক পরের ঘটনা। শান্তিনিকেতন থেকে বার্তা এল পতিসরের ম্যানেজার শৈলেশচন্দ্র মজুমদারের কাছে। তাতে লেখা, ‘শৈলেশ, তোমার সংস্কৃতজ্ঞ কর্মচারীকে এইখানে পাঠাইয়া দাও।’ হরিচরণ পৌঁছলেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সংস্কৃতের শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করলেন। শিক্ষকতায় নিষ্ঠা এবং বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতার কারণে ঋজুদেহী ব্রাহ্মণটি অচিরেই রবীন্দ্রনাথের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠলেন। বছর তিন পর হঠাৎ একদিন তিনি হরিচরণকে ডেকে বললেন, ‘আমার একটি নির্দেশ তোমাকে পালন করতে হবে। আমি তোমাকে একটি পান্ডুলিপি দেব। সেই পান্ডুলিপির প্রণালী অনুসরণ করে তুমি সংস্কৃত প্রবেশ রচনা কর। গুরুদেবের আদেশ, হরিচরণ প্রবল উৎসাহে কাজ শুরু করে দেন। কোনও সহকারী ছাড়া একাই কঠোর পরিশ্রম করে তিন খন্ড সংস্কৃত প্রবেশ রচনা করে ফেললেন হরিচরণ। কিছু দিন পর রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আবার বললেন, ‘এ বার তুমি বাংলা ভাষায় একটি এমন অভিধান তৈরি কর, যে অভিধান কখনও কেউ লেখেননি।’

শুরু হল বঙ্গীয় শব্দকোষের কাজ। দিনরাত এক করে চলল শব্দের সন্ধান। প্রাথমিক অবস্থায় আশ্রমের গ্রন্থাগার থেকে ঘেঁটে ঘেঁটে পুরনো বাংলা বই থেকে শব্দ সংগ্রহ করতে লাগলেন। তার পর আধুনিকের দিয়ে এগোলেন। পদ্যের বইও বাদ দিলেন না। সেই সময়ে প্রকাশিত বাংলা ভাষার অভিধান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা থেকে প্রকাশিত প্রাদেশিক শব্দমালা ও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শব্দসংগ্রহ থেকেও অনেক নতুন শব্দ পেয়ে যান। প্রাকৃত ব্যাকরণ থেকেও বেশ কিছু বাংলা শব্দের মূল সংস্কৃত শব্দ ও তদ্ভব শব্দও জোগাড় করেছিলেন।

নিদারুণ অর্থাভাব কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বহুবার। হরিচরণকে দেওয়ার মতো অর্থ তখন রবীন্দ্রনাথের কাছেও ছিল না। টাকার অভাবে এক সময় শান্তিনিকেতনের চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলেন হরিচরণ। সেন্ট্রাল কলেজে সংস্কৃত শিক্ষকের চাকরি নিলেন। অর্থ তো আসতে লাগল, কিন্তু তাঁর মনে পড়ে থাকে আশ্রমে। তার উপর অভিধানের কাজও বন্ধ। সব মিলিয়ে প্রচ- মানসিক পীড়ায় ভুগতে লাগলেন তিনি। আবার সব ছেড়ে যোগ দিলেন শান্তিনিকেতনে। অর্থাভাব দূর করতে রবীন্দ্রনাথ ঠিক করলেন কাশিমবাজারের রাজা মণীন্দ্রচন্দ্রের থেকে সাহায্য চাইবেন। সেই মতো তিনি হরিচরণকে সঙ্গে করে রাজার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। রাজা সব শুনে হরিচরণকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কতদিন লাগবে এই অভিধান শেষ করতে?’

– অন্তত ন’বছর।

Ñ কাজ চালিয়ে যান। আমি মাসে পঞ্চাশ টাকা করে বৃত্তি দেব।

প্রথম বৃত্তি মেলার পর হরিচরণ খুশি হয়ে আবেগে রবীন্দ্রনাথের পা জড়িয়ে ধরলেন। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘স্থির হও। আমি তো শুধু কর্তব্যই করেছি।’

এক বৈশাখের দুপুরে শান্তিনিকেতনের আকাশে জমেছে ঘন মেঘ। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে চারদিকে। শুরু হল ঘন ঘন বজ্রপাত। রবীন্দ্রনাথের বাড়ির ঠিক পাশেই প্রচ- আওয়াজ করে বজ্রপাত হয়। ছুটে এসে রবীন্দ্রনাথ জানলা দিয়ে বাইরে দেখেন, দূরের একটি খড়ের চালের কুঁড়ে ঘরে আগুন ধরে গেছে। আঁৎকে উঠলেন, এ যে হরিচরণের ঘর! চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওরে কে কোথায় আছিস, জলদি আয়, হরিচরণের বাড়িতে বাজ পড়ে আগুন ধরে গেছে।’ রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের কিছু ছেলেকে নিয়ে ছুটলেন হরিচরণের বাড়ির দিকে। গিয়ে দেখেন পন্ডিতমশাই কাজে ব্যস্ত। এত কিছু ঘটে গেছে টেরই পাননি। তৎক্ষণাৎ তুমুল জোরে বৃষ্টি নামে। আশ্রমের ছেলেরা আগুন নেভায়। এমনই মনোযোগ ছিল হরিচরণের। সে যাত্রায় অবিশ্যি পন্ডিতমশাইয়ের ঘরের বই ও পান্ডুলিপিগুলো বেঁচে যায়, যেগুলি ছিল তাঁর জীবনের থেকেও মূল্যবান।