প্রাচীন ভারতে নারীর অবস্থা ও অবস্থান

309

ড. ময়না তালুকদার

নারী ও পুরুষÑমানব সংসারের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং একে অপরের পরিপূরক।  বৈদিকসাহিত্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে যে, এই বিশ্বসংসার নর এবং নারীর সমন্বয়ে গঠিত । কিন্তু  কালক্রমে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে পুরুষ নারীর উপর প্রাধান্য লাভ করতে থাকে। সমাজপতিদের সৃষ্ট আইন-কানুন, বিধিব্যবস্থা পুরুষকে ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী করে তোলে। আর নারীর অধিকার খর্ব করে পুরুষের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্প, সমাজ ও সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যের সর্বোত্তম তথা সর্বজনগ্রাহ্য প্রমাণপত্র বৈদিকসাহিত্য এবং মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত। এই ঐতিহ্যপূর্ণ গ্রন্থসমূহে নারীজীবনেরও বিভিন্ন দিক বিধৃত হয়েছে। নারী শুধু একজন নারীই ননÑ তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে  অর্থাৎ, সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকেন। আলোচ্য প্রবন্ধে বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ও মনুসংহিতা-র যুগে নারীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যবহ এবং তাদের মর্যাদা যে সুউচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিল তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।

সামাজিক জীবন

গঠনগত দিক থেকে বৈদিকসমাজের পারিবারিক কাঠামো ছিল পিতৃতান্ত্রিক। সে সময়ে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রÑএই চার শ্রেণির মানুষ বসবাস করত এবং এদের সামাজিক স্তর বিন্যাসও ছিল। বৈদিকযুগ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পরিচয়বাহী হলেও, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের মতো সমান অধিকার ভোগ করতেন। প্রাচীন আর্য ঋষিরা উপলব্ধি করেছিলেন সকলের মাঝে কল্যাণ বিতরণ করতে হলে নারীকে পঙ্গু করে রাখা যাবে না। তাই ঋগে¦দ-এর দশম ম-লে নববধূকে আশীর্বাদ করে ঋষি বলছেন :

সম্রাজ্ঞী শ্বশুরে ভব সম্রাজ্ঞী শ্বশ্রাং ভব।

ননান্দরি সম্রাজ্ঞী ভব সম্রাজ্ঞী অধি দেবৃষু ॥ (ঋগে¦দসংহিতা, পৃ.৫৭২)

অর্থাৎ, তুমি শ্বশুরের উপর প্রভুত্ব করো, শাশুড়ীকে বশ করো এবং ননদ ও দেবরগণের উপর সম্রাজ্ঞীর মতো হও।

বৈদিকযুগের নারীরা উচ্চবর্ণের পুরুষদের ন্যায় উপনয়ন লাভ করত। বাল্য বিবাহের প্রচলন ছিল না বলে ধারণা করা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক হয়েই নারীরা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতেন। তবে নারীদের বিবাহযোগ্য বয়স সম্বন্ধে সুস্পষ্ট কোনো কথা উল্লিখিত হয়নি। তবে স্বামী নির্বাচনের ব্যাপারে নারীদের যে স্বাধীনতা ছিল, এর  প্রমাণ পাওয়া যায় :

কিয়তী যোষা মর্যতো বধূয়োঃ পরিপ্রীতা পন্যসা বার্যেণ।

ভদ্রা বধূর্ভবতি যৎসুপেশাঃ স্বয়ং সা মিত্রং বনুতে জনে চিৎ॥ (ঋগে¦দসংহিতা, ১০/২৭/১২)

অর্থাৎ, সমাজে কিছু কিছু স্ত্রীলোক আছে, যারা অর্থের লোভে নারী সহবাসে আকাক্সক্ষী মানুষদের প্রতি আসক্ত হয়। আবার যে স্ত্রীলোক ভদ্র, যার শরীর সুগঠন, সে অনেক পুরুষের মধ্য হতে আপনার মনমতো প্রিয়পাত্রকে পতি মনোনীত করে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত থাকা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। কিন্তু সে যুগে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের বহুবিবাহের কথাও জানা যায়। ঋগে¦দে-এর কয়েকটি মন্ত্রে নারীদের একাধিক পতি গ্রহণের কথা জানা যায়। যেমন, সূর্যের কন্যা সূর্যা অশ্বিদ্বয়কে পতিত্বে বরণ করেছিলেন। বৈদিকযুগে বিধবাবিবাহও প্রচলিত ছিল। ঋগে¦দের ঋষিগণ বিধবা নারীর বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাতেন, যা সদ্য বিধবাকে উদ্দেশ করে ব্যক্ত এ-বাণী থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায় :

উদীষর্ব  নার্যভি জীবলোকং গতাসুমেতমূপ শেষ এহি।

হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সং বভূথ॥।( ঋগে¦দসংহিতা, ১০/১৮/৮,পৃ.৪৭৮)

অর্থাৎ, হে নারী, সংসারে ফিরে চল, গাত্রোত্থান করো, তুমি যার নিকট শয়ন করতে যাচ্ছ সে গতাসু অর্থাৎ, মৃত হয়েছে। মৃতের নিকট অবস্থান করা সমীচীন নয়। চলে এস। যিনি তোমার পাণিগ্রহণ করে গর্ভাধান করেছিলেন, সে পতির পতœী হয়ে যা কিছু কর্তব্য ছিল সবই তোমার করা হয়েছে।

উপর্যুক্ত মন্ত্রের তাৎপর্য এই যে, মৃত স্বামীর প্রতি সমস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করেছ তুমি। এখন সংসারধর্মে ফিরে এসে পুনরায় বিবাহ করতে তোমার আর কোনো সামাজিক বাধা নেই। সে সময়ে বিধবা নারীরা দেবরকেও বিয়ে করতে পারত। এছাড়াও কুমারী নারীর গর্ভজাত সন্তানকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হতো। মোটকথা, সেই সমাজ নারীর বেঁচে থাকার অধিকারটুকু কেড়ে নেয়নি, পুড়িয়ে মারাও শুরু করেনি ধর্ম বা সমাজের দোহাই দিয়ে।

বৈদিকযুগ ছিল একটি পরিপূর্ণ উন্নত সভ্যতার যুগ। রাষ্ট্্রীয় ধন-সম্পদ সমভাবে বণ্টিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় ধন-সম্পদে  নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অধিকার থাকবে। ধনবণ্টনের এই সমতার কথা ঋগে¦দসংহিতা ( ১/৮১/৬) মন্ত্রে লক্ষ্য করা যায়। নারীদের এই সম্পত্তির অধিকারকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে :

১.            স্বামীর সম্পদের অধিকার

২.            স্ত্রীধন

৩.            সম্পদের উত্তরাধিকার

১. ঋগে¦দের বিবাহের মন্ত্রে পরিবারের সম্পত্তিতে স্বামীর মালিকানার পাশাপাশি স্ত্রীকেও সম্পত্তির সহ-মালিকানা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবাহের সময় স্বামী ঈশ্বরের নামে এরূপ শপথ করেন যে, অর্থনৈতিক সকল বিষয়ে স্ত্রীর সকল অধিকার ও স্বার্থ বজায় রাখা হবে।

২. সাধারণ অর্থে স্ত্রীধন শব্দটি এমন সম্পদকে নির্দেশ করেÑ যার উপর নারীদের একক অধিকার রয়েছে। স্ত্রীধন বলতে সাধারণত অলংকার, রতœমণি, হীরা-জহরত ইত্যাদি বোঝায়। এসব সম্পদ একান্তই নারীদের নিজস্ব সম্পদ বলে স্ত্রীধন বলে গণ্য হতো। বৈদিক যুগে এসব অস্থায়ী সম্পদকে স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বলেই ঘোষণা করা হয়েছে।

৩. বৈদিক যুগে কন্যারা পৈতৃক সম্পত্তিরও যে অধিকার পেতেন তার উল্লেখ আছে, ঋগে¦দসংহিতার দ্বিতীয় ম-লের ১৭ নং সূক্তে :

অমাজুরিব পিত্রোঃ সচা সতী সমানদা মদসস্ত¡ামিয়ে ভগমৎ।

কৃধি প্রকেতমুপ মাস্যা ভর দদ্ধি ভাগং তন্বোযেন মামহঃ॥ (ঋগে¦দসংহিতা ,২/১৭/৭)

অর্থাৎ. হে ইন্দ্র!  পিতামাতার সঙ্গে আজীবন বসবাসকারী কুমারী কন্যাগণ যেরূপ পিতার সম্পত্তিতে ভাগ পায়, সেরূপ আমিও তোমার নিকট  ধন প্রার্থনা করি। তুমি সকলের নিকট সেই ধন ও ধনের পরিমাণ প্রকাশ করো এবং তা সম্পাদন করো ।

সুতরাং তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীদের সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার সংরক্ষিত ছিল।

বৈদিক পরবর্তী রামায়ণের যুগে নারীর বিলক্ষণ সম্মান ছিল। এজন্য অযোধ্যাকা-ে, দারাকে অর্থাৎ, নারীকে আত্মা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, পতœীকে পতি অপরজ্ঞানে হীনদৃষ্টিতে বা নীচভাবে দেখতে পারবে না।

মহাভারত-এ নারীর স্বাধীন সঞ্চরণ ও গৌরবময় বহু ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। মহাভারত-এর আদিপর্বে উল্লেখ আছে, ‘‘অনাবৃতাঃ কিল পুরা স্ত্রিয় আসন্ বরাননে। কামচারবিহারিণ্যঃ স্বতন্ত্রাশ্চারুহাসিনি ॥ (১১৬/৪) অর্থাৎ, সকল স্ত্রীলোকই অনবরুদ্ধ ছিল এবং তারা ইচ্ছা অনুসারে বিহার করে বেড়াত এবং যথেষ্ট স্বাধীন ছিল’’ (হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য [সম্পা.],১৩৮৭:১২৮৫) । এছাড়া ভার্যারূপে নারীরা যে যথেষ্ট সম্মানিত ছিলেন, তারও প্রকৃষ্ট উদাহরণ মহাভারত-এর আদিপর্বে দেখা যায় :

অর্দ্ধ ভার্য্যা মনুষ্যস্য ভার্য্যা শ্রেষ্ঠতমঃ সখা।

ভার্য্যা মূলং ত্রিবর্গস্য ভার্য্যা মূলং তরিষ্যতঃ ॥

ভার্য্যাবন্তঃ ক্রিয়াবন্তঃ সভার্য্যা গৃহমেধিনঃ।

ভার্য্যাবন্তঃ প্রমোদবন্তে ভার্য্যাবন্তঃ শ্রিয়ান্বিতাঃ॥ (হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য [সম্পা], ১৩৮৭:১০২২)

অর্থাৎ, ভার্যা পতির অর্ধাঙ্গস্বরূপ, পরমবন্ধু এবং ত্রিবর্গ অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ ও কাম লাভের মূল কারণ। আবার যাদের ভার্যা আছে, তারাই শুধুমাত্র যজ্ঞাদিক্রিয়ার অধিকারী হয়, তারাই গৃহস্থ, তারাই আমোদ-প্রমোদ করতে পারে এবং তারাই সকল ক্ষেত্রে শোভা পেয়ে থাকে।

ভার্যারূপে নারীরা শুধু ঘরে বা সংসারেই রাজত্ব করেছেন তা নয়। সকলের আহারে-বিহারে নারীরাই কর্তৃত্ব করতেন।  মহাভারতের বনপর্বে দেখা যায়,পথশ্রান্ত দ্রৌপদীর পথখেদ দূর করতে নকুল ও সহদেব হাতের দ্বারা আস্তে আস্তে তাঁর চরণমর্দন করেছিলেন (কালীপ্রসন্ন সিংহ [সম্পা],১৯৯১:২০৬)। সে যুগে নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে মুখে কেউ কিছু বললেও সামাজিক জীবনে নারীর অনেক অধিকারই দেখা যায়। তখন প্রায়ই রাজকন্যাদের স্বয়ংবর প্রথায় বিয়ে হতো। সাবিত্রী, দময়ন্তী, কুন্তী, দ্রৌপদী প্রমুখ অনেকের বিবাহে কন্যারা নিজেরাই বর বরণ করেছেন। স্বয়ংবরপ্রথাতেই বোঝা যায়, তখন যুবতীবিবাহই সমধিক প্রচলিত ছিল। তবে বাল্যবিবাহ প্রথা যে ছিল না, তা নয়।

কাজেই মহাভারত-এর যুগে দ্বিতীয়বার পতিবরণ বৈধ ও সর্বসম্মত ছিল। মহাভারত-এর যুগে নারীদের বহুবিবাহের কথাও জানা যায়। দ্রৌপদী একই সঙ্গে পঞ্চপা-ব অর্থাৎ যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব-এই পাঁচ স্বামীর সঙ্গে সংসার করেছিলেন। মহাভারতে বহু বিধবার উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁরা সসম্মানে বেঁচে ছিলেন। সত্যবতী, কুন্তী এবং বহু মৃত বীরের ও কৃষ্ণের স্ত্রীদের উল্লেখ আছে, এঁরা কেউই সহমৃতা হননি; শুধু মাদ্রী একাই সহমৃতা হয়েছিলেন সেও সমাজের নির্দেশে নয়, ব্যক্তিগত অপরাধবোধে। এঁরা কেউই পুনর্বার বিবাহ করেননি। সেই যুগে পারিবারিক অবকাঠামোতে নারীর যথেষ্ট সম্মান ছিল।

মহাভারতের যুগেও দেখা যায় নারী পিতা-মাতার সম্পত্তির অধিকারিণী হতেন। অনুশাসনপর্বে ভীষ্ম স্পষ্টভাবে বলেছেন :

পুত্র আত্মাস্বরূপ ও দুহিতা পুত্র হইতে ভিন্ন নহে। অতএব দুহিতাসত্ত্বে কখনই অন্যে অপুত্রকের ধনাধিকারী হয় না। মাতার যৌতুক-ধনে কন্যারই সম্পূর্ণ অধিকার। দৌহিত্র পিতা ও মাতামহ উভয়েরই পি-দান করতে পারে, এই নিমিত্ত অপুত্রকের ধনে দৌহিত্র ভিন্ন অন্যের অধিকার নাই। ধর্ম্মশাস্ত্রানুসারে পুত্র ও দৌহিত্র উভয়ই সমান। (কালীপ্রসন্ন সিংহ [অনূদিত],২০০৫ :১১১২)

সুতরাং সেই সময় থেকেই কন্যারা যে পিতা-মাতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিণী  ছিলেন তা স্পষ্ট।

ধর্মশাস্ত্রকার মনু রচিত মনুসংহিতা এই বিষয়ের সবচেয়ে অধিক প্রামাণিক। মনুসংহিতা-য় সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে মানবজীবনের সর্ববিধ দিকের একটি ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক, নৈতিক এবং সর্বোপরি শাস্ত্রানুগ ব্যাখ্যা লক্ষ করা যায়। মনুর সময়ে নারীর সামাজিক অধিকার কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। তার স্মৃতিশাস্ত্রবিষয়ক গ্রন্থ মনুসংহিতা-য় তিনি নারীর স্বাধীনতা, দায়িত্ব, কর্তব্য, শুচিতা প্রভৃতি বিষয় ধর্মীয় বিধিবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তারপরও তিনি নারীদের সম্পর্কে যে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন, তারও অনেক উদাহরণ  রয়েছে। তিনি বলেছেন :

যত্র নার্য্যস্ত পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ।

যত্রৈতাস্ত ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ ॥ (মনুসংহিতা, ৩/৫৬)

অর্থাৎ, যেখানে নারীরা পূজিত হন, সেখানে দেবতারা প্রসন্ন হন; আর যে পরিবারে নারীরা অপূজিত অর্থাৎ, অসম্মানিত হন, সেখানে দেবতার উদ্দেশে অর্পিত যাগ-যজ্ঞ-ক্রিয়া-কর্ম সমুদয় নিষ্ফল হয়ে যায়।

মনু নারীদের পতিনির্বাচন ব্যাপারে উদার ছিলেন। তিনি বলেছেন, অপাত্রকে কন্যাদানের চেয়ে কুমারী কন্যাকে যাবজ্জীবন ঘরে রাখা ভালো, তথাপি নির্গুণ পাত্রে কন্যাসম্প্রদান করা উচিত নয়। তিনি আরো বলেছেন, যথাকালে পিতামাতা কন্যার বিবাহ না দিলে কন্যা যদি স্বয়ং কোনো পুরুষকে পতিরূপে বরণ করে নিতে চায়,তবে তাতে কোনো দোষ নেই।

মনু নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি হোক এটা চাননি। তাই অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন :

‘‘যথৈবাত্মা তথা পুত্রঃ পুত্রেণ দুহিতা সমান অর্থাৎ, আত্মার সমান পুত্র, পুত্রের সমান কন্যা। সেই আত্মা থাকতে কেন অন্যে ধন পাবে ?’’ ( মনুসংহিতা, ৯/১৩০)

সুতরাং তার সময়েও পিতার সম্পত্তিতে শুধু পুত্র ও কন্যাই  উত্তরাধিকারী  হবেন, অন্য কেউ নয়, তা স্পষ্ট।

অতএব, মানবজীবন চিত্রণে মনু কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীজাতিকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন যেমন করছেন, তেমনি আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা ক্ষুণœ হয় এরকম অনেক নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।

ধর্মীয় জীবন

বিশাল এই সাহিত্যে দেব-দেবতা, যাগযজ্ঞ, সামাজিক রীতি-নীতি, ধর্ম, রাজনীতি-অর্থনীতি ইত্যাদির বর্ণনা ছাড়াও তৎকালীন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণের চিত্রও ফুটে উঠেছে। আমরা ঋগে¦দসংহিতা থেকে তৎকালীন নারীসমাজের শিক্ষাদীক্ষা ও তাদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ রূপরেখা জানতে পারি। বৈদিক সাহিত্য, রামায়ণ ও মহাভারত-এ পুরুষের ন্যায় ব্রহ্মচর্যপালনরতা বহু ব্রহ্মচারিণীর নাম ঊল্লিখিত হয়েছে। বৈদিক যুগের নারীরা পুরুষের মতোই মন্ত্রপাঠ, মন্ত্ররচনা, যাগযজ্ঞ, ধর্মীয় সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। যজ্ঞক্ষেত্রে যজমানের পতœীকে পাশে থাকতে হতো। সেই সময়ে নারীরা পুরুষের মতো ধর্মচর্চায় সমান স্বাধীনতা ভোগ করে তাদেরই পাশে বসে একের পর এক মন্ত্র উচ্চারণ করতেন। তাই আমরা লক্ষ করি বৈদিকযুগে নারীরা গৃহকর্মের পাশাপাশি অপার্থিব বিষয় তথা ধর্মীয় কাজেও অংশগ্রহণ করতেন। ঋগে¦দ-এর  বহু মন্ত্রেও স্বামী ও স্ত্রীর একত্রে যজ্ঞ সম্পাদনের বিবরণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ ঋগে¦দ-সংহিতা-র প্রথম ম-লের ১৭৩তম সূক্তের দ্বিতীয় মন্ত্রটি উদ্ধৃত করা হলো

অর্চদ্বৃষা বৃষভিঃ  স্বেদুহব্যৈর্মৃগো নাশ্নো অতি যজ্জৃ গুর্যাৎ।

প্র মন্দযুর্মনাং গূর্ত হোতা ভরতে মর্ষো মিথুনা যজত্রঃ॥ (ঋগে¦দসংহিতা,পৃ.৩১৪)

অর্থাৎ, হব্যপ্রদায়ী যজমান অধ্বর্যু প্রভৃতির সাথে ইন্দ্রকে স্বপ্রদত্ত হব্য দ্বারা স্তুতি করলে তৃষিত মৃগের ন্যায় দ্রুত ইন্দ্র যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হবেন।  হে ইন্দ্র ! মর্ত্যবাসী স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে মিলে স্তোত্র অভিলাষী দেবতাগণকে স্তব করে যজ্ঞ নিষ্পন্ন করছেন।

রামায়ণ-এ আরো দেখা যায়, রামের মা কৌশল্যা ছিলেন পিতা দশরথের যজ্ঞাংশভাগিনী। পতœীকে ছাড়া যজ্ঞসম্পাদন সম্ভব নয় বিধায় রামচন্দ্রও অশ্বমেধযজ্ঞ করতে ইচ্ছুক হয়ে যজমানের অধিকার লাভার্থে সীতার এক স্বর্ণময়ী মূর্তি গড়িয়ে নিয়ে যজ্ঞ নিষ্পন্ন করেছিলেন,কেননা ওই সময়ে সীতা নির্বাসনে ছিলেন।

মহাভারত-এর বনপর্বে উল্লেখ আছে, একজন ব্রাহ্মণ পা-বমাতা কুন্তীদেবীকে পবিত্র ব্রহ্মসূত্রদ্বারা ভূষিত করে অথর্ব বেদোক্ত গায়ত্রীশিরসমন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন (কালীপ্রসন্ন সিংহ [অনূদিত],২০০৫:৭১১)। এ  প্রসঙ্গে কুন্তীর উক্তি প্রণিধানযোগ্য-‘‘আমি ভর্ত্তার রাজত্বসময়ে অশেষ সুখভোগ, বিবিধ মহাদান ও যথাবিধি সোমরস পান করিয়াছি’’(কালীপ্রসন্ন সিংহ [অনূদিত],২০০৫: ১৩৮৮)। উপর্যুক্ত তথ্য পর্যালোচনায় বলা যায় যজ্ঞে সোমের অধিকার তখনও নারীদের ছিল।

শিক্ষা জীবন

বৈদিকযুগে দ্বিজ পুরুষদের ন্যায় নারীরাও বেদ অধ্যয়নের মাধ্যমে উপনয়নে দীক্ষিত হতেন। বৈদিকযুগে অনেক মন্ত্রদ্রষ্টা নারীঋষি, শিষ্যা ও ব্রহ্মবাদিনীর নাম পাওয়া যায়। ঋষি রোমশা, লোপামুদ্রা, বিশ্ববারা ও অপালা, ঘোষা, সাবিত্রী, সূর্যা, বাক্, ইন্দ্রাণী, শ্রদ্ধা, উর্বশী, সরমা প্রমুখ এঁরা সকলেই ঋগে¦দের কোনো না কোনো মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি। এই তথ্য অনুসারে তৎকালীন বৈদিক সমাজে নারীর জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বলে প্রতীতি জন্মে। বৈদিক যুগে পিতামাতা যে কেবল বিদ্বান্ পুত্রের কামনা করতেন, তা নয়। বিদুষী কন্যার জন্মের জন্যও তাঁদের অত্যুগ্র আকাক্সক্ষা ছিল। বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-এ বিদুষী কন্যাপ্রাপ্তির জন্য পিতামাতার দ্বারা অনুষ্ঠিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কথার উল্লেখ আছে। সেখানে সুস্পষ্টরূপে বলা হয়েছে : কেউ যদি দীর্ঘায়ুযুক্তা বিদুষী কন্যা লাভ করতে ইচ্ছুক হন; তাহলে তারা (স্বামী-স্ত্রী) দুইজন তিলমিশ্রিত অন্ন রন্ধন করে তাতে ঘি মিশিয়ে খাবেন।

অথ য ইচ্ছেদ্দুহিতা মে প-িতা জায়তে সর্বমায়ুরিয়াদিতি তিলৌদনং।

পাচয়িত্বা সর্পিষ্মন্তমশ্নীয়াতামীশ্বরৌ জনয়িতবৈ॥(অতুলচন্দ্র সেন ও প্রমুখ [অনূদিত ও সম্পা.],১৯৮৬:৮৭৫)

বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-এর তৃতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ ও অষ্টম ব্রাহ্মণে উল্লেখ আছে যে, ব্রহ্মবাদিনী গার্গী একজন প্রথিতযশা জ্ঞানী ও বিদুষী নারী ছিলেন। তিনি বাচকèবীর অবিবাহিতা কন্যা। মিথিলারাজ জনক কর্তৃক আহুত বিশ্বের প্রথম দার্শনিক সম্মেলনে তিনি আমন্ত্রিত হন এবং রাজসভায়, বহু জ্ঞানী ব্যক্তির সমাবেশে, ব্রহ্মজ্ঞ যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক  বিতর্কে ব্যাপৃত হন। এ বিতর্কে কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারেননি বিধায় দুজনেই বিদ্যায় ও জ্ঞানে সমান পারদর্শী বলে প-িত মহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন।

মহাভারত-অনুসারে দ্রৌপদীর ধর্মদর্শিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল সর্বজনবিদিত। নীতিশাস্ত্র-বিষয়েও দ্রৌপদীর অগাধ পা-িত্য ছিল বলে জানা যায়। মহাভারত-এ দ্রৌপদী ছাড়াও অনুরূপ অনেক বিদুষী নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়, এঁরা জ্ঞান-গরিমায় শিক্ষিত সমাজে বিশিষ্ট স্থান দখল করেছিলেন। ক্ষত্রিয় কন্যা বিদুলা বহু বেদ অধ্যয়ন করে বিশ্রুতা ও বহুশ্রুতা তপস্বিনী হয়েছিলেন :

ক্ষত্রধর্মরতা দান্তা বিদুলা দীর্ঘদর্শিনী।

বিশ্রুতা রাজসংসৎসু শ্রুতবাক্যা বহুশ্রুতা ॥(কালীপ্রসন্ন সিংহ [অনূদিত],২০০৫:৮১১)

সুতরাং বৈদিকযুগে এবং পরবর্তী কালে নারীরা বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাচেতনায় স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিলেন এবং শিক্ষাদীক্ষায় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন

বৈদিকসাহিত্য, রামায়ণ এবং মহাভারত-এ নারীর রাজনৈতিক কর্মকা- সম্পর্কেও নানা তথ্য পাওয়া যায়। ঋগে¦দ-সংহিতার কিছু কিছু মন্ত্রে নারীর অপূর্ব বীরত্ব এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অসীম দক্ষতার বর্ণনা পাওয়া যায়। ঋগে¦দ-এ উল্লেখ আছে যে, নারীদেরও সামরিক শিক্ষা প্রদান করা হতো। এমন কি খ্যাতনামা রাজাদের মহিষীগণও রণাঙ্গনের পুরোভাগে নির্ভীকচিত্তে যুদ্ধ করতেন। ঋগে¦দের অশ্বিনীসূক্তে  রাজা খেলের রানী বিশ্পলার বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনি নারীসমাজের এক অত্যুজ্জ্বল স্মরণীয় ঘটনা। এতে উল্লেখ আছে :  ‘‘একদা বিশ্পলা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুসেনার সাথে ঘোরতর যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন, তখন তাঁর একটি পা পাখির একটি পাখার মতো ছিন্ন হয়েছিল। ফলে তাঁর একটি ঊরু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীর থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করতে হয় এবং শল্য চিকিৎসকগণ লৌহনির্মিত একটি কৃত্রিম ঊরু তাঁর দেহে সংযোজন করেন-যাতে তিনি শত্রুর ধন লাভ করতে সমর্থ হন’’ (ঋগে¦দসংহিতা,পৃ.২৩১)। এই ঘটনা প্রমাণ করে বৈদিক যুগের নারীরা সামরিক বাহিনীতেও বীরত্বের সাথে যুদ্ধকার্য পরিচালনা করতেন।

মহাভারতে দেখা যায় : অসীম সাহসী বীরনারী সুভদ্রা যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর স্বামীর রথ চালনা করেন ও যুদ্ধ করে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেন।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এ কথা বলা যায়, বৈদিকযুগের নারীরা পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবন ও জীবনাচরণের নানাস্তরে পুরুষের প্রায় সম-অধিকার ভোগ করত। বৈদিকযুগ ও তার পরবর্তীযুগের নারীর জীবন-কথা আলোচনা করতে গিয়ে যে উদ্ধৃতি ঊল্লেখ করেছি, তাতে স্পষ্টভাবে বলা যায়, নারীদের অবস্থান উচ্চাসনেই ছিল এবং তারাও যে পিতা ও স্বামীর সম্পত্তির  উত্তরাধিকারী ছিলেন সেটা স্পষ্ট। চৈতন্যদেবের আবির্ভাবও নারীকে আরো পুনর্জাগরিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। চৈতন্যদেব বুঝেছিলেন নারী হলো সমাজের অর্ধাংশ। এই অর্ধাংশকে সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখে জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। তাই তিনি নারীকে নৈতিক, মানসিক এবং আত্মিক বলপ্রদানের মাধ্যমে বলীয়ান্ করে স্বীয় মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে সজাগ করে তোলেন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়