৬ ডিসেম্বর জাতীয় কূটনৈতিক দিবস ঘোষণার দাবি

4

সংবাদদাতা।। ডিসেম্বর (২০২৩) বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বাংলাদেশকে ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতির ৫২তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় আলোচনার বিষয় ছিলবাংলাদেশভারত মৈত্রীর পটভূমি

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোস্তাফা জব্বার

আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য স্বাধীনতা মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত বৃটিশ মানবাধিকার নেতা জুলিয়ান ফ্রান্সিস এবং ১৯৭১: গণহত্যানির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘরের ট্রাস্টি সম্পাদক অধ্যাপক চৌধুরী শহীদ কাদের অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ তপন পালিত

সভাপতির ভাষণে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কালপঞ্জিতে অত্যন্ত স্মরণীয় দিন ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে এই দিনে ভারত ভূটান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বিজয় অনিবার্য করেছে এই স্বীকৃতি একই সঙ্গে ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধরত বঙ্গবন্ধুর সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈধতা দিয়ে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছে

ভারত কতৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে নিয়োজিত সাত কোটি বাঙালির জন্য৭১এর ডিসেম্বর ছিল এক অসামান্য আনন্দের দিন, যেদিন ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে মুজিবনগর সরকারের উপর্যুপরি অনুরোধ এবং যুদ্ধরত বাঙালির তীব্র প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টের অধিবেশনে যখন ঘোষণা দিলেন তাঁর সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন সরকারি বিরোধী দলের সদস্যরাজয় বাংলাদেশবলে বিপুল হর্ষধ্বনি করে ওঠেন আনন্দ প্রকাশের জন্য এই দিনের অধিবেশন শ্রীমতি গান্ধীর ভাষণের পর পরই মুলতবি ঘোষণা করা হয়

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ডিসেম্বর ভারত ভুটানের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি অর্জন আজকের সভা থেকে আমরা দাবি জানাচ্ছি ডিসেম্বর জাতীয়ভাবেকূটনৈতিক দিবসহিসেবে উদযাপনের জন্য

একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ ইন্দিরা গান্ধীর নামে করার দাবি জানিয়ে শাহরিয়ার কবির বলেন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে আমরা ঢাকায় মেয়রকে স্মারকপত্র দিয়েছি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ ইন্দিরা গান্ধীর নামে করার জন্য প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক আমাদের কথাও দিয়েছিলেন আশা করি বর্তমান সরকার আমাদের এই প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে

মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা অবদানের কথা স্মরণ করে গান্ধী ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাদের স্বাধীনতার জন্য যে অবদান রেখেছেন তার কোনো তুলনা হয় না ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বাংলাদেশ মুক্ত করার অভিযানে অংশ নেয়াসহ প্রত্যক্ষপরোক্ষ নানাভাবে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারত বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণ তাদের সহানুভূতি এবং সমর্থন বেশ জোরালোভাবে প্রকাশ করেছে

ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিনÑ মন্তব্য করে মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আমাদের স্বাধীনতায় ভারতের অবদানের জন্য সেই দেশের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা কখনো ম্লান হবে না সেদিন ভারত এগিয়ে না এলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোথায় গিয়ে ঠেকতো, আন্দাজ করা সহজ নয় কথা স্বয়ং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশের পথে দিল্লিতে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিতে সেখানে জনসমুদ্রের মাঝে কৃতজ্ঞতাভরে উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি তাদের মনে ভারত বিদ্বেষ প্লেগ রোগের মতো বিরাজমান মুক্তিযুদ্ধকালেও বেশ কিছু লোক স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল তাদের মধ্যে যারা এখনো জীবিত আছে এবং তাদের বংশধররা এখনো এজন্য ভারতকে সহ্য করতে পারছে না শুধু একটি কারণেই যে, ভারত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুখ্য সহায়ক হিসাবে ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় তারা আজও মেনে নিতে পারছে না, আর তাই ভারত বিরোধিতা তাদের বুকে তখন রক্তক্ষরণ হয়েছিল, এখনও হচ্ছে

মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা স্মরণ করে নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাদল অস্ত্রপ্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সুসজ্জিত করে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠিয়েছিল এক কোটি শরণার্থীকে নয় মাস অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবাসহ যা যা প্রয়োজন সব দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল ভারতের সরকার জনসাধারণ তাদের এই অসাধারণ সাহায্য ছাড়া কখনও মাত্র নয় মাসে আমাদের বিজয় সম্ভব হতো না কথাটা আমরা গভীরভাবে সবসময় অনুধাবন করি বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী চিরকাল অটুট থাকুক এটাই আমাদের আকাক্সক্ষা

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের যে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে ভারত ডিসেম্বর কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে আমাদের গেরিলা বাহিনীকে ভারত প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী একযোগে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দশদিন পূর্বেই ভারত বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয় যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কূটনৈতিক সাফল্য আমরা মুক্তিযোদ্ধারা চাই ডিসেম্বরকে জাতীয়ভাবে কূটনৈতিক দিবস হিসেবে পালন করা হোক

মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু বৃটিশ মানবাধিকার নেতা জুলিয়ান ফ্রান্সিস মুক্তিযুদ্ধের ৫২ বছর আগের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি অক্সফামের হয়ে কলকাতা আগরতলার শরণার্থী শিবিরগুলোতে কাজ করেছি এবং প্রায় ছয় লক্ষ বাংলাদেশি শরণার্থীর দেখভালের দায়িত্বে ছিলাম তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা স্মরণ করে বলেন, নভেম্বরের শেষে এবং ডিসেম্বরের শুরুতে শীতকালে শরণার্থীদের দুর্ভোগ যখন চরম সীমায় পৌঁছে এমন সময় পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত সহযোগিতা, বাংলাদেশে তাজউদ্দিনের সঙ্গে তার বৈঠকসহ কলকাতা, মুম্বাই কটকএর তরুণ মেডিকেল ছাত্রদের ত্রাণকার্যে সহযোগিতা এবং চিকিৎসা সহায়তার কথা তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন

সাধারণ জনগণের আবেগ আর সহমর্মিতা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে চাঙ্গা করেছিলÑ মন্তব্য করে ১৯৭১: গণহত্যানির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘরের ট্রাস্টি সম্পাদক অধ্যাপক চৌধুরী শহীদ কাদের বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস কেবল বুলেট আর বারুদে লেখা হয়নি, একাত্তর কেবল রক্ত আর অশ্রুর গল্প নয় মুক্তিযুদ্ধ মানবিকতা, সহমর্মিতা আর ভালোবাসার কারুকাজে এক জনযুদ্ধ সেই যুদ্ধ ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহের (পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়) নানাবিধ সম্পৃক্ততায় সিক্ত অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতন, সীমান্তজুড়ে শরণার্থীদের ঢল অন্যদিকে সীমান্তপাড়ের রাজ্যগুলোর কেন্দ্রীয় রাজ্য সরকারের পাশাপাশি রাজ্যের সাধারণ জনগণের আবেগ আর সহমর্মিতা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে চাঙ্গা করেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের সীমান্তরাজ্যগুলোর সাধারণের কাছে পরিণত হয়েছিল একটি জনযুদ্ধে শরণার্থী সেবা, আশ্রয় প্রদান, চাঁদা সংগ্রহ, প্রতিবাদ সমাবেশ, সহায়ক সমিতি গঠন, মুক্তিফৌজের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নানাধিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সাধারণ জনগণ পরিণত হয়েছিল সেই জনযুদ্ধের একজন যোদ্ধায়