সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশ ঃ প্রাপ্তি কি

82

রানা দাশগুপ্ত

প্রথম পর্ব

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তার জন্মের ৩২ বছরে দু’টি মহাসমাবেশ করেছে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দল এখানে সমাবেশ করার সাহস দেখায়নি। অন্য কোন সামাজিক বা মানবাধিকার সংগঠন তা’ নয়ই। ঐক্য পরিষদ প্রথম মহাসমাবেশটি আয়োজনের আগে বুঝতে পারে নি এর ব্যাপ্তি হবে কতদূর। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, সমাবেশ ফ্লপও করতে পারে। যারা ভেবেছিলেন, তারাই ফ্লপ করেছেন। এটি ছিল বাস্তবতা।

মহাসমাবেশের আয়োজনের পেছনে যে চিন্তাটি সর্বাগ্রে কাজ করেছে তা’ হল সারা দেশে সাংগঠনিক শক্তি ও ব্যাপ্তি কতটুকু হয়েছে গত তিন দশকে তা পরখ করা। দ্বিতীয়টি হল-মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে বলেছিলেন, যা করবেন ঐক্যবদ্ধভাবে করবেন।

সংখ্যালঘুদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১২ সালের দিকে এক লিখিত চুক্তি হয় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সম্প্রতি প্রয়াত মেজর জেনারেল (অবঃ) সি আর দত্ত বীরউত্তম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী, আদিবাসী জনগণের অবিসংবাদিত নেতা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)-র মধ্যে। এর মধ্য দিয়ে পাহাড় ও সমতলের ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রত সবাইকে এক মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। এর পরপরই শুরু হয় সমতলের তিন সম্প্রদায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় নানান সংগঠনকে একই ছাতার তলে নিয়ে আসা। এর অর্থ এ নয় যে, সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব বিলোপ করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদে একীভূত করা। সব সংগঠন স্ব স্ব অস্তিত্ব ও কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে তবে নি¤œতম কর্মসুচির ভিত্তিতে ঐক্য পরিষদের পরিচালিত মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত থাকবে। এ চিন্তা থেকে ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু সংগঠনসমূহের সমন্বয় কমিটি যার সমন্বয়ক ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক। সময়ের ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে প্রায় ২৩টি সংগঠন ঐক্যমোর্চায় সম্পৃক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে তা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রথম সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গত ২০১৫ সালের ৪ ডিসেম্বর। মূল তাগাদা ছিল তুখোড় বাগ্মী, সাংসদ সুরণঞ্জিত সেনগুপ্তের। অজয় রায় (প্রয়াত), পংকজ ভট্টাচার্য, বিমল বিশ্বাস, অসিত রায় প্রমুখ রাজনীতিকরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার  ক্ষেত্রে পরামর্শক হিসেবে পেছন দিক থেকে কাজ করেছেন। সংখ্যালঘু-আদিবাসীর লক্ষাধিক জনতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এ মহাসমাবেশে অস্তিত্ব রক্ষার প্রত্যয়ে এবং সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে জাতীয় ঐকমত্যের ৭-দফা দাবিনামা পেশ ও গৃহীত হয়। জাতীয় মানাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডঃ মিজানুর রহমান এতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাাদক এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এ দাবিনামা সংখ্যালঘু ঐক্য মোর্চার পক্ষে উপস্থাপন করলে লক্ষাধিক জনতা হাত তুলে তাতে সমর্থন জানান। দাবিনামায় সেদিন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশী মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএস), বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি, জগন্নাথ হল এ্যালামনাই এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি, শ্রীশ্রী ভোলানন্দ গিরি মহারাজ আশ্রয় ট্রাস্ট, বাংলাদেশ হিন্দু লীগ ও বাংলাদেশ পঞ্চায়েত ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর করেছিলেন।

জাতীয় ঐক্য মত্যের ৭ দফা দাবীনামার প্রস্তাবনায় উল্লেখ ছিল-

ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতিনির্বিশেষে আপামর জনগণের মিলিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতা অর্জনে এদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অবদান, আত্মত্যাগ কারো চেয়ে কম নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে এরা। পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের ৩০৯টি আসনের মধ্যে ৭২টি আসন এবং সে সময়কালের আতাউর রহমান খান ও আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভার ১০ জনের মধ্যে ৪ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকা সত্বেও অসম্প্রদায়িক রাজনীতি গড়ে তোলার স্বার্থে তৎকালীন সংখ্যালঘু নেতৃত্ব-ই পৃথক নির্বাচনের বিপরীতে যুক্ত নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করেছিলেন, যা ১৯৫৬-তে পাকিস্তান গণপরিষদে গৃহীত হয়। এই যুক্ত নির্বাচনের  ভিত্তিতে ১৯৭০-র নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি।

কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়, সীমাহীন আত্মত্যাগ সত্বেও আজ স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সীমাহীন বঞ্চনা, বৈষম্য, নিগৃহণ, নিপীড়নের শিকার। রাজনীতির মাঠে তারা ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে রাজনৈতিক দলগুলোতে যেমন তাদের কোন অংশীদারিত্ব নেই, তেমনি কোন প্রতিনিধিত্ব নেই সরকারে, সংসদে, রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে, জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংস্থায়। বর্তমান মন্ত্রীপরিষদে একজনও পূর্ণমন্ত্রী নেই। ৩০০টি সংসদীয় আসনে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৭, সংরক্ষিত ৫০টি মহিলা আসনে মাত্র ১ জন। মোদ্দা কথা, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাতাবরণ থেকে সংখ্যালঘুদের অনেক দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে, হচ্ছে।

শুধু কি তা-ই, অসহায় বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সুদীর্ঘকালের অব্যাহত আন্দোলন, সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণে, নিবন্ধন আইনের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণে, হিন্দু ও বৌদ্ধ নারীদের অধিকার রক্ষায় হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণয়ন এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলেও তা আজো যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। মহলবিশেষ অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। এসব সংখ্যালঘু স্বার্থবান্ধব আইনের সুফল যাতে ভুক্তভোগীরা পেতে না পারে তার জন্যে চক্রান্ত চলছে নানাভাবে, নানা কৌশলে। অবর্ণনীয় হয়রানির মুখোমুখি করা হচ্ছে তাদের।

অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশ আজো সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বৈষম্যমুক্ত হতে পারে নি। সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল ছিন্ন করে এখনো সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারেনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। রাষ্ট্রধর্ম আজো বহাল রয়েছে। ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি মেলেনি। মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ সর্বত্র মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। পাকিস্তানি আমলের মতো একই কায়দায় ধর্মীয়-জাতিগত ও আদিবাসী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর দৈহিক নির্যাতন-ই শুধু নয়, তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মঠ-মন্দির-গির্জার ওপরও হামলা চলছে। বেশিরভাগ হামলা চলছে ঠিক একাত্তরের মতো সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে।

নারীদের ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এর পেছনে যে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনা আছে তা হলো বাংলাদেশকে সংখ্যালঘুশূণ্য করা, আবহমানকালের বৈচিত্র্যের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা। অথচ নির্বিকার সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল। নাগরিক সমাজও তেমন সোচ্চার নয়। হরিজন, দলিত জনগোষ্ঠী, ঋষি ও চা বাগান শ্রমিকদের অবস্থা আরো ভয়াবহ।

ধর্মীয় বৈষম্য নিরসনে খানিকটা উদ্যোগ বিগত কয়েক বছরে দেখা গেলেও তা এখনো যথাযথ নয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্যে মাথাপিছু বরাদ্দ যেখানে ১১ টাকা, সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যে মাত্র ৩ টাকা যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের চেতনাকে খর্ব করে। বিগত ৭ দশকেরও ঊর্ধ্বকাল ধরে অব্যাহত নির্যাতন, নিপীড়ন, বৈষম্য, বঞ্চনা, অবহেলার শিকার হয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আজ অগ্রসর জনগোষ্ঠী থেকে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। তাদের উন্নয়নে জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে কোন বরাদ্দ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কথিত কল্যাণের নামে গঠিত ট্রাস্টসমূহ চলে ব্যাংকের আমানতের সামান্য সুদের টাকায়। অথচ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় কল্যাণের জন্যে গঠিত ফাউন্ডেশনের বরাদ্দ আসে প্রতিবছর জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে। ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও ইসলাম ধর্মভিন্ন অপরাপর ধর্মের শিক্ষার জন্যে আজও দেশের বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষকের নিয়োগ নেই। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি ঘটলেও জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে নিয়োগ, পদোন্নতিতে দৃশ্যমান উদ্যোগ আজো দেখা যাচ্ছে না। সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ নেই বললেই চলে।

পাকিস্তানি আমলের মতো স্বাধীন বাংলাদেশেও নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর  অস্তিত্ব আজ বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার ১৯৪৭-র ২৯.৭% থেকে ২০১১ সালে ৯.৭%-এ নেমে এসেছে। অথচ ৭১-এর প্রাক্কালে তা ছিল ২০%-র উপরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হার ৯৮.৬% থেকে বর্তমানে আনুমানিক ৪৮%-এ ঠেকেছে অর্থাৎ তারা নিজ বাসভূমিতে সংখ্যাগুরু থেকে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। উপ-মহাদেশীয় রাজনীতিতে ‘দেশত্যাগ’-র বিষয়টি বড় ইস্যু হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ, অধিকার, নিরাপত্তা সর্বোপরি অস্তিত্ব নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করছে এ অঞ্চলের শান্তি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা।

এ প্রেক্ষাপটে আপামর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের অস্তিত্বের সংকট থেকে উত্তরণ, সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতায়ণের জোর তাগিদ অনুভব করছে। এ তাগিদবোধ থেকে এদেশের ধর্মীয়-জাতিগত ও সংখ্যালঘু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সকল সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতক্রমে দেশ ও জাতির সামনে জাতীয় ঐকমত্যের ৭ দফা দাবিনামা উত্থাপিত হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক-নাগরিক শক্তিসমূহ এ দাবি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন।

৭-দফা দাবিনামায় যা রয়েছে তা হলো-

১.            ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্বশীলতা

(ক)         জাতীয় সংসদে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যথাযথ অংশীদারিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষে যুক্ত নির্বাচনের (সার্বজনীন ভোটের) ভিত্তিতে ২০% হারে (৭০-র জনসংখ্যা অনুসারে) ৬০টি আসন সংরক্ষণ করতে হবে। জনপ্রতিনিধিত্বশীল সকল সংস্থায়ও অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

(খ)          সাংবিধানিক পদসহ প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বস্তরে, পররাষ্ট্র, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সরকারি চাকরির সকল স্তরে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ন্যুনতম ২০% পদায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে।

(গ)          ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এ লক্ষে দেশের সব রাজনৈতিক দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি সাংগঠনিক কমিটির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে অন্যুন ২০% হারে সংখ্যালঘু-আদিবাসীর অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হবে।

২.            সাংবিধানিক বৈষম্য বিলোপকরণ

(ক)         রাষ্ট্রীয় অন্যতম মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সম্পর্কীয় সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক ২ক অনুচ্ছেদের বিলোপ করে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌল আদলে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির যথাযথ  বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

(খ)          আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকারের ও পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে হবে।

(গ)          ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক রক্ষাকবচ (ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হধষ ঝধভবমঁধৎফ) সম্বলিত অনুচ্ছেদ সংবিধানে সংযোজন করতে হবে।

৩.           সম-অধিকার ও সমমর্যাদা

(ক)         ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও সমতলের আদিবাসীদের কল্যাণে ও উন্নয়নে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।

(খ)          ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও কল্যাণে জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে বার্ষিক বরাদ্দ প্রদান করে বিদ্যমান কল্যাণ ট্রাস্টসমূহকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করতে হবে এবং অনুরূপভাবে আদিবাসীদের জন্যও পৃথক ফাউন্ডেশন গঠন করতে হবে।

(গ)          ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করতে হবে।

(ঘ)          সংসদ অধিবেশন, মন্ত্রীপরিষদের শপথ গ্রহণসহ রাষ্ট্রীয় সকল কর্মসূচি শুরুর পূর্বে সকল ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের ব্যবস্থা করতে হবে।

(ঙ)          ’৪৭ থেকে এ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে দেশের সংখ্যালঘু-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমানহারে  হ্রাসের কারণ নির্ণয়নে ও তা রোধে সুপারিশ প্রদানের নিমিত্তে সংসদীয় কমিশন গঠন করতে হবে।

(চ)          আদিবাসী ককাসের অনুরূপ ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুবিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠনে উদ্যোগ নিতে হবে।

(ছ)          সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

৪.            স্বার্থবান্ধব আইন বাস্তবায়ন ও প্রণয়ন

(ক)         পার্বত্য শান্তিচুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নসহ এ চুক্তির আলোকে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে অনতিবিলম্বে তা কার্যকর করতে হবে।

(খ)          সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যার নিশ্চিত সমাধানের নিমিত্তে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করে তাদের ভূমির অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।

(গ)          ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু স্বার্থবান্ধব অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, দানের ঘোষণা সম্বলিত নিবন্ধন আইন ও হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

(ঘ)          দেবোত্তর সম্পত্তি আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে;

(ঙ)          অধিকতর অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হরিজন, দলিত, ঋষি সম্প্রদায় এবং অবহেলিত চা-শ্রমিকদের পেশা ও ভূমির অধিকারসহ তথা সামগ্রিক কল্যাণে সকল প্রকারের সামাজিক বৈষম্য নিরসনে বিশেষ আইন প্রণয়নসহ নানাবিধ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে শিক্ষিত হরিজন, দলিত, ঋষি জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি কোটার মাধ্যমে নিয়োগের নিমিত্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।

৫.            শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য নিরসন

(ক)         জাতীয় স্কুল টেক্সট বুক বোর্ড প্রণীত ও অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকে দেশের সকল ধর্ম ও জাতিসত্বার সম-মর্যাদার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

(খ)          দেশের সকল বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অপরাপর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সকল পর্যায়ের ধর্মশিক্ষকের ক্ষেত্রে বেতন বৈষম্যের অবসান করতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, অনুদানে ও পরিচালনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সকল ধর্মের ধর্মীয় শিক্ষায়তন চালু করতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মশিক্ষার বিদ্যমান শিক্ষায়তনগুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে।

৬.           দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ

(ক)         ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।

(খ)          সংখ্যালঘু সুরক্ষাজনিত আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত দ্রুত বিচার আইন ও সন্ত্রাস দমন আইনে শাস্তির বিধান বাড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের দ্রুততম সময়ে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে।

(গ)          ২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনাবলীর বিষয়ে গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশন রিপোর্টের সুপারিশমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

(ঘ)          সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসরোধে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

৭.            মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ

যে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, বর্ণবৈষম্য ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করতে হবে।

যথাযথ ক্ষমতায়ন ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণসহ উল্লিখিত দাবিসমূহ বাস্তবায়ন করা না হলে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্য হবে, যা কারও কাছে কাম্য নয়।

মূলতঃ যে ৭-দফা দাবি নিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের জন্ম হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ২০ মে জাতীয় ঐক্য মত্যের ৭-দফা দাবিনামা তারই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ। দুই দাবিনামা পাশাপাশি রাখলেই উপলব্ধি করা যাবে-বিগত ৩২ বছরে এ দেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুরা এগিয়েছে কত দূর, তবে যেতে হবে অনেক দূর।

দুঃখজনক হলো-সর্বাত্মকভাবে সফল এ মহাসমাবেশের সংবাদ প্রকাশে ও প্রচারে মহলবিশেষ সেদিন কেন যে গণমাধ্যমসমূহকে নানান পরামর্শ দিয়েছিল তা আজও অজানা। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো-র মতো পত্রিকায়ও ভেতরের এক পৃষ্ঠায় মহাসমাবেশের সংবাদ গুরুত্বহীনভাবে প্রচার করেছিল আর ছবি ছাপিয়েছিল এভাবে যে বেশ কয়েকটি খালি চেয়ারের মধ্যে গুটিকতেক লোক বসে আছে মাত্র।