শেখ হাসিনার ‘হাঁড়িভাঙা’ আম কূটনীতির প্রশংসায় মুখর দিল্লি

6

বাংলা ট্রিবিউন।। দিল্লি থেকে রঞ্জন বসু।। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রিয় ফল যে আম, সে কথা সুবিদিত। দুই বছর আগে ভারতে সাধারণ নির্বাচনের সময় এক সাক্ষাৎকারে বলিউড তারকা অক্ষয় কুমার প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কি আম খোসা ছাড়িয়ে খান নাকি গোটা আম থেকেই চুষে খেতে পছন্দ করেন! সেই প্রশ্ন আর তার জবাব ভাইরাল হয়েছিল গোটা দেশেই।

এবার সেই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে এক হাজার কেজির পেল্লায় এক বাক্স রংপুরের ‘হাঁড়িভাঙা’ আম পাঠিয়ে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেললেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোমবার (৫ জুলাই) দিল্লিতে ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে সেই উপহারের বাক্স তুলে দেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান। প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য যেমন হাজার কেজি আম পাঠানো হয়েছে, একইভাবে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দের জন্যও পাঠানো হয়েছে আরও হাজার কেজি।

বাদ যাননি বাংলাদেশ লাগোয়া ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরাও। শেখ হাসিনার আম উপহার পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি, ত্রিপুরার বিপ্লব দেব, মেঘালয়ের কনরাড সাংমা আর আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মার কাছেও। ফলে দিল্লি থেকে কলকাতা, গুয়াহাটি থেকে শিলং বা আগরতলা-সর্বত্রই আজ হাঁড়িভাঙার অনন্য স্বাদ আর অপূর্ব সুবাস!

ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের কর্মকর্তারা যদিও বারবারই বলছেন এটা পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ‘ব্যক্তিগত প্রীতি উপহার’ এবং এরমধ্যে কূটনীতি খোঁজার অর্থ হয় না।  তারপরেও ভারতে পর্যবেক্ষকরা কিন্তু এই উপহারের গুরুত্ব অস্বীকার করতে পারছেন না।

দিল্লির জেএনইউ-তে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়া স্টাডিজের প্রধান সঞ্জয় ভরদ্বাজের কথায়, ‘মনে রাখতে হবে এই উপহার এলো এমন একটা সময়ে, যখন ভারত বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা দিতে পারছে না। চুক্তির মর্যাদা দিতে না পারায় প্রধানমন্ত্রী মোদি একে যথেষ্ট বিব্রতকর অবস্থায় আছেন, কিন্তু তার মধ্যেও ঢাকার পাঠানো এই উপহার নিশ্চয় তাকে আশ্বস্ত করবে ও ভরসা জোগাবে।’

ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রিও শেখ হাসিনার এই ‘মুভে’র প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত। তিনি বলছিলেন, কূটনীতিতে সব কথা তো সব সময় উচ্চারণ করে বলতে হয় না। কিন্তু এই আম উপহার এই বার্তাটাই দিচ্ছে যে যেদিন ভারত আবার টিকা রফতানি করার মতো জায়গায় যাবে, সেদিন সবার আগে কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বাংলাদেশের প্রয়োজনের কথাটাই ভাবতে হবে।

কলকাতার বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফও মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই টিকা সংকটের মধ্যেও শেখ হাসিনা কিন্তু ভারতের সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও বিরূপ মন্তব্য করেননি। বরং সে দেশের জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, ভারতই বা কী করবে? সেখানে সংক্রমণের সংখ্যা যেভাবে হু হু করে বেড়ে গেছে!

এই পটভূমিতে দেশের ভেতরে সমালোচনা হতে পারে জেনেও যেভাবে তিনি ভারতের নেতানেত্রীদের কাছে নিজের সবচেয়ে পছন্দের আমটি পাঠিয়েছেন, সেই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে পত্রিকাটি।

এর আগে গত বছর দুর্গাপুজোর সময় ভারতে পদ্মার ইলিশ উপহার পাঠিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ঠিক তখনই ভারত আচমকা বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলেও ইলিশ যাওয়াতে কিন্তু ছেদ পড়েনি। তবে বাংলাদেশ থেকে আমের এই ধরনের উপহার প্রথমবার ভারতে এলো।

আরও জানা যাচ্ছে, বাছাই করা ‘হাঁড়িভাঙা’ আম দেখেশুনে বাক্সবন্দি করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছয়জন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে নিজের শ্বশুরবাড়ির দেশ রংপুরে পাঠিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তারা সেগুলো নিজেরা তদারকি করে ট্রাকে তুলেছেন, তারপর সেই আম বেনাপোল-পেট্রাপোল, আখাউড়া আর তামাবিল-ডাউকি-এই তিনটি স্থলবন্দর দিয়ে রোববার ভারতে ঢুকেছে।

কলকাতা থেকে এরপর ট্রেনপথে সেই উপহারের আম সোমবার সকালেই দিল্লিতে পৌঁছায়। তারপর দূতাবাস মারফত তা বিকালের মধ্যেই চলে আসে সাত নম্বর লোককল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনে আর রাইসিনা হিলসের রাষ্ট্রপতি ভবনে।

রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম খেয়ে নরেন্দ্র মোদি এখন কী টুইট করেন, কিংবা ফোন ঘুরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে কীভাবে ধন্যবাদ জানান-সেদিকেই তাকিয়ে আছে দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক মহল।