শেখ হাসিনার সঙ্গে মোদির বৈঠকে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই, উদ্বোধন মিতালি এক্সপ্রেসের

5

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক।। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশে সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শনিবার (২৭ মার্চ) অপরাহ্নে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বেশকিছু সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ ট্রেন, তিনটি নতুন বর্ডার হাটসহ কয়েকটি প্রকল্প ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করা হয়েছে। সই হয়েছে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক।

শনিবার বিকেল পাঁচটার দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এলে  টাইগার গেটে তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথমে তাঁরা একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। এরপর দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, সংযোগ, বিদ্যুৎ ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতাসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে উন্নয়নের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন তাঁরা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ সফর এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের পর দুই দেশের সরকারপ্রধান একে অপরের মধ্যে বিভিন্ন উপহার বিনিময় করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বানানো একটি করে সোনা ও রূপার কয়েন মোদিকে উপহার দেন শেখ হাসিনা। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সাজানো একটি রূপার কয়েন দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশকে ভারত সরকারের দেওয়া করোনা প্রতিরোধক ১২ লাখ ডোজ টিকা উপহারের প্রতীক বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে তুলে দেন মোদি। এছাড়া শেখ হাসিনার হাতে ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্সের প্রতীকী চাবি দিয়েছেন তিনি।

আজ সকালে নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় তথা শেষ দিনের কর্মসূচি শুরু হয় সাতক্ষীরায় পীঠস্থান যশোরেশ্বরী মন্দিরে উড়ে গিয়ে। তিনি সেখানে পুজো দেন, ধ্যান করেন। মন্দির প্রদক্ষিণের পর ভক্তদের সঙ্গে কথা বলেন।

সেখান থেকে গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় উড়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থানে, যেখানে সমাধিতে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এখানে মোদিকে স্বাগত জানান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ছোট বোন শেখ রেহানা। এই প্রথম একজন বিদেশি সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এলেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে নরেন্দ্র মোদি গোটা এলাকা ঘুরে দেখেন।

টুঙ্গিপাড়া থেকে মোদি যান কাশিয়ানীতে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রধান তীর্থপীঠ শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে হরিচাঁদ ঠাকুর মন্দিরে পূজা দেওয়ার পর সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই সফরে মোদির সঙ্গে আছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা সদস্য শান্তনু ঠাকুর।  সমাবেশে মোদি বলেছেন, ভারত ও বাংলা উভয়ই নিজেদের বিকাশ ও প্রগতির চেয়ে সারা বিশ্বের বিকাশ ও প্রগতি চায়। দুই দেশই বিশ্বে অস্থিরতা ও সন্ত্রাসের পরিবর্তে শান্তি চায়। ভারত ও বাংলাদেশের একসঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা উচিত। এটা আমাদের কর্তব্য। ভারত আজ সবার সঙ্গে, সবার বিকাশ, সবার বিশ্বাস-এ মন্ত্র নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখানে সহযাত্রী। বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে বিকাশ ও পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। এখানে ভারত আপনাদের সহযাত্রী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ভারতের ১৩০ কোটি ভাইবোনের পক্ষ থেকে প্রেম ও শুভকামনা নিয়ে এসেছি। সবাইকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে শুভেচ্ছা। তিনি বলেন, গতকাল শুক্রবার ঢাকায় জাতীয় দিবস উদ্যাপন অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের শৌর্য ও ক্ষমতার এক অপূর্ব প্রদর্শন দেখেছেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর নেতৃত্ব, ভিশন ও বাংলাদেশের লোকের প্রতি তাঁর বিশ্বাস এক অনন্য উদাহরণ।

মোদি বলেন, ভারতে উৎপাদিত করোনাভাইরাসের টিকা যাতে বাংলাদেশে পৌঁছায়, তা ভারত নিজের কর্তব্য বলে মনে করেছে। করোনায় ভারত-বাংলাদেশ তাদের নিজেদের সামর্থ্যকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছে।

বক্তব্যে হরিচাঁদ ঠাকুরের বন্দনা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব যে মানবতা ও মূল্যবোধের স্বপ্ন দেখে, হরিচাঁদ ঠাকুর সে জন্য তাঁর নিজের জীবন ত্যাগ করেছেন। নারীশিক্ষায় হরিচাঁদ ঠাকুরের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, আমরা আজ নারীশক্তিকে পুরো বিশ্বে এগিয়ে যেতে দেখছি। উনি (হরিচাঁদ) তা আগেই দেখেছেন। আজ যেভাবে ভারত-বাংলাদেশ সরকার দুই দেশের সম্পর্ক মজবুত করেছে, সাংস্কৃতিকভাবে একই কাজ ঠাকুরবাড়ি ও হরিচাঁদ ঠাকুর বহু দশক ধরে করে আসছেন।

বাংলাদেশের ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়িকে ভারত ও বাংলাদেশের আত্মার সম্পর্কের ‘তীর্থস্থান’ অভিহিত করে মোদি বলেন, এই মন্দিরে আসার ইচ্ছা তাঁর অনেক দিনের, আজ সেই ইচ্ছা পূরণ হলো।

দলিত ও পীড়িতদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছানোর ওপর জোর দিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এখন থেকে ওড়াকান্দির শিক্ষায় ভারতের জনগণও যুক্ত হবে, মাধ্যমিক স্কুলগুলোকে উন্নত করবে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মতুয়া সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করবে ভারত সরকার। তিনি বলেন, মেয়েদের জন্য একটি মিডল স্কুল স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি মতুয়া সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা যেন পড়াশোনার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় সে জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করে দেওয়া হবে। এসবে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে ভারত সরকার। মোদি বক্তব্য শেষ করেন ‘জয় বাংলা, জয় হিন্দ, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরজীবী হোক’ বলে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এখান থেকে রওনা হন দিল্লির উদ্দেশ্যে।