রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও হিন্দু কাজল

260

কাজল দেবনাথ                                              

এক।। ৩১ ডিসেম্বর ২০০৭ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, কূটনীতিক ও সক্রিয়  মানবাধিকার কর্মী কে এম সোবহান মৃত্যুবরণ করেন। ৩১ ডিসেম্বর ২০০৯ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে ধানমন্ডি বিলিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় প্রয়াত বিচারপতি কে এম সোবহান স্মরণ সভা। সমাজের সকল অঙ্গনের বরেণ্য প্রায় সবাই উপস্থিত তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে। স্থান সংকুলানের অভাবে অনেকেই হলের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। মঞ্চে প্রধান অতিথি তদানিন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পাশে প্রাক্তন দুই প্রধান বিচারপতি অনুষ্ঠান অলংকৃত করেছেন, একজন সভাপতি বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন অন্যজন প্রধান বক্তা বিচারপতি হাবিবুর রহমান। স্মরণ অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ শুরু হয়েছে। হঠাৎ অনুষ্ঠান সঞ্চালক ঘোষণা করলেন, এবার শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজল দেবনাথ। আমি তো অবাক, কিছুটা বিব্রতও বটে। হল ভর্তি বরেণ্য সব চেনা মুখ। ওনাদের কথা শুনতে এসেছি। আমাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছু বলতে হবে তা একেবারেই জানতাম না। একটু ইতস্তত করছি এবং তা প্রকাশও করলাম। কিন্তু সঞ্চালক আবারও আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘোষণা করলেন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজল দেবনাথ এবার শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। অগত্যা উপবিষ্ট দুই প্রধান বিচারপতিকে সালাম জানিয়ে মঞ্চের দিক পা বাড়ালাম।

যতটুকু মনে পড়ে, সভা প্রধানকে সম্ভাষণ জানিয়ে শুরু করেছিলাম এভাবে…  ‘পরম শ্রদ্ধেয় প্রয়াত বিচারপতি কে এম সোবহানের স্মরণ সভায় আমাকে যে পরিচয়ে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো, এমনটি কিন্তু হবার কথা ছিলো না। পাকিস্তান আমলের শুরুতে আমি ছিলাম শিশু কাজল, এরপর ছাত্র ইউনিয়নের কাজল, শেষে মুক্তিযুদ্ধের কাজল। দুর্ভাগ্য, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে আজ আমি হিন্দু কাজল। মঞ্চে উপবিষ্ট পরম শ্রদ্ধেয় প্রাক্তন দুই প্রধান বিচারপতিকে প্রণাম জানিয়ে এবং তাঁদের পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে আজ আমি ক’টি শক্ত কথা বলতে চাই। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ বঙ্গবন্ধুর ‘৭২ এর সংবিধানে আবারো সংশোধনী আনলেন। ৮ম সংশোধনীতে দু’টি বিষয় ছিলো, একটি ‘হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ’ অন্যটি ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। দু’টো বিষয় নিয়েই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পৃথকভাবে কয়েকটি রিট মামলা দায়ের হয়। একটি কথা আইন অঙ্গনে বহুলপ্রচলিত, ‘বার এবং বেঞ্চ’ একে অপরের সম্পূরক। দুঃখজনকভাবে প্রায়শই তা অদৃশ্যমান হলেও ৮ম সংশোধনীর ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করলাম এ দু’এর দারুণ এক মেলবন্ধন। ৮ম সংশোধনীর দু’টি বিষয় নিয়ে রিট হলেও হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়টিতে ‘বার এবং বেঞ্চ’ একজোট হয়ে স্মরণকালের স্বল্পতম সময়ে উচ্চ আদালতের প্রতিটি স্তরের শুনানি শেষে রায়ে তা বাতিল বলে ঘোষিত হলো, অর্থাৎ ৮ম সংশোধনীর হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ অংশটি অকার্যকর হয়ে গেলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সুধাংশু শেখর হালদার প্রমুখ ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিকের করা ৮ম সংশোধনীর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিষয়ে করা রিটটি নিষ্পত্তি তো দূরের কথা, শুনানির জন্য আলোর মুখটি পর্যন্ত দেখলো না। সেই যে ডিপ ফ্রিজে ঢুকলো তা আজও বের হলো না। এখানে উপস্থিত দুই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির কাছে আবারও ক্ষমা চেয়ে আজ সেই নিষ্ঠুর সত্য কথাটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে চাই। উচ্চ আদালতের ‘বার এবং বেঞ্চ’ এর বিবেকের যদি সামান্যতম দংশন থাকতো, তাহলে ৮ম সংশোধনীর ‘হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ’ বাতিলের সাথে সাথে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বিষয়টিও শুনানিতে উঠতো এবং তা বাতিল না হবার কোনো কারণ ছিলো না। কিন্তু তা হয় নি। সংবিধানে হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ বাতিল হয়েছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রয়েছে। আর সে কারণেই পাকিস্তান আমলের ‘কাজল’ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে আজ ‘হিন্দু কাজল’ এবং আমার পরিচয়, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ম-লীর সদস্য।’…..

দুই।। আরেকটি ৯ জুন আমরা অতিক্রম করলাম বুধবার। ১৯৮৮ সালের এই দিনে তদানিন্তন রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারী এরশাদ ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বিলটিতে অনুমোদন দেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের জন্মও কিন্তু সেই কারণে এবং প্রতি বছর তারা এ দিনটি কালো দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বিলটি পাশের দিন যদিও লোক দেখানো অর্ধদিবস হরতাল সহ মৃদু কিছু প্রতিবাদ জানিয়েছিল প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ সম্পুর্ণ উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করে। ’৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি হতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র এই দু’টিকে উপরে ফেলে সামরিক শাসক জিয়া ৬ এপ্রিল ’৭৯ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের সর্বনাশটি প্রথম শুরু করেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর হতে ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকা-কে বৈধতা দান এবং সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ সংযোজন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আরেক স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ ৯ জুন ’৮৮ সংবিধানের ৮ম সংশোধনী এনে ঘোষণা দেন ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’।

তিন।। ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। ২০১০ সালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ফলে সামরিক শাসনের সকল অপকর্ম হতে রাহুমুক্ত হয় বাংলাদেশ। সুযোগ সৃষ্টি হয়, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ওপর ভর করে হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শিক অবস্থান বঙ্গবন্ধুর ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাবার। যদিও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ সরকার দুই তৃতীয়াংশের বেশী সাংসদ নিয়ে ক্ষমতায়। যে দল পাকিস্তান আমলে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ হতে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ‘আওয়ামী লীগ’ হতে পারে সেই দলের কাছে এটাই কি প্রত্যাশিত নয় যে ’৭৫ এবং ’৮৮ পরবর্তী লক্ষ্যভ্রষ্ট বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। বাংলাদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধুর ’৭২ এর সংবিধান। কিন্তু তা তো হয়ইনি, বরঞ্চ ২০১১ সালের ৩ জুলাই ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান এক জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়েছে। সংবিধানে আজ সামরিক শাসক জিয়ার ‘বিসমিল্লাহ’ও আছে, স্বৈরশাসক এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ও আছে। একই সাথে আছে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের রক্ষাকবজ ‘৭২ এর সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদ, যার প্রতিটির সাথে প্রতিটির অবস্থান সাংঘর্ষিক। দুর্ভাগ্য এখানেই।

উল্লেখ্য, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ এর বিরুদ্ধে করা রিটের মামলাটি কিন্তু এখনো হিমাগারে। সংবিধানের ৫ম সংশোধনী অবৈধ, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়টি এসেছে পুরনো ঢাকার মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে ১৯৭৭ সালে সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট মামলাকে কেন্দ্র করে। ’৫২ হতে ’৭১ এর অর্জন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ কি নিরবে নিভৃতে এমনি করেই তিলে তিলে হারিয়ে যাবে ?

লেখক : বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য।