মুজিববর্ষে ইতিহাসের পাতা থেকে

71

যুক্ত নির্বাচন প্রথার
সমীচীনতা

প্রাদেশিক আইনসভা¬র নির্বাচন পদ্ধতি প্রশ্নের উত্তর প্রদত্ত
তদানিন্তন শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম দফতরের মন্ত্রী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বক্তৃতা
(০১ লা অক্টোবর, ১৯৫৬)

আজ আমরা পূর্ব পাকিস্তান পরিষদ থেকে জাতীয় পরিষদের নিকট আমাদের মতামত পাঠাব যে আমরা যুক্ত নির্বাচন চাই, না পৃথক নির্বাচন চাই। যিনি পৃথক নির্বাচনের পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, তাঁর বক্তৃতা আমি শুনেছি। তাঁর যুক্তিগুলোও আমি শুনেছি। কিছুদিন পূর্বে যখন আমরা শাসনতন্ত্র তৈরি করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, তখন থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে যুক্ত নির্বাচন হবে, কি পৃথক নির্বাচন হবে। শাসনতন্ত্রে বিধান আছে যে প্রাদেশিক পরিষদগুলি নির্বাচন প্রথা স্থির করে জাতীয় পরিষদের নিকট জানাবে। এ সম্পর্কে অনেক আলোচনা হয়েছে, ইসলামী আদর্শের কথাও বলা হয়েছে। গণতন্ত্রের কথাও আমরা শুনেছি। দ্বিজাতি থিওরীর কথাও উঠেছে। পাকিস্তান কেন আমরা চেয়েছিলাম ? আমার একটা কথা মনে পড়ে, পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে যাঁরা এক জাতিত্বে বিশ্বাস করছেন। ইসলাম বিশ্বাস করে বিশ্বভ্রাতৃত্বে। আজকে একদল লোক খোদাকে ছোট করতে চায়। আল্লাহ শুধু মুসলমানেরই আল্লাহÑ তিনি দুনিয়ার অন্যান্য মানুষের আল্লাহ নন। এ সম্বন্ধে এটুকু কেবল আমি বলতে চাই যে আল্লাহ যিনি, তিনি দুনিয়ার সকল মানুষের আল্লাহ।
দুই জাতি থিওরির কথা বলতে বলতে কেউ বলেছেন, পাকিস্তানে দুইটি জাতি আছে। জাতি হিসাবে যদি ধরা হয়, তাহলে আমরা পাকিস্তানে ৫, ৬, ৭টি জাতি আছি, মুসলমান জাতি, খৃষ্টান জাতি, শিখ জাতি, বৌদ্ধ জাতি, হিন্দু জাতি, পার্শী জাতি ইত্যাদি। অনেকেই বলেন ইহা ছাড়া তপশীলভুক্ত একটি জাতিও আছে।
কি রূপে পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়েছে, এবার আমি সে সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করতে চাই। এই প্রদেশ যুক্ত নির্বাচন চায়, কি পৃথক নির্বাচন চায়, আজকে আমরা এই পরিষদের মাধ্যমে সে সম্পর্কে মতামত জানাব। জাতীয় পরিষদে যখন শাসনতন্ত্র রচিত হয় তখন সভাপতিত্ব করেছেন মি. গিবন। তিনি লাইলাহা ইল্লাল্লাহু বিশ্বাস করেন না। তিনি আমাদের ইসলামী শাসনতন্ত্র পাশ করে দিয়েছেন। জাতীয় পরিষদে সর্বমোট ৮০ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জন সংখ্যালঘু সদস্য ইসলামী শাসনতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সেখানে হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ এক সঙ্গে ভোট দিয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র পাশ করেছেন। এটা জায়েজ কিনা ? ধর্মের নামে যুগে যুগে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে। এ সম্বন্ধেও আমি এখন কোন আলোচনা করতে চাই না। আমি প্রশ্নটির বাস্তব দিক দিয়ে আলোচনা করতে চাই। যুক্ত নির্বাচন জায়েজ কি না জায়েজ, তা প্রমাণ করবার মত মৌলানা পরিষদে আছেন। তাঁরা বলেছেন যে, মুসলমানরা একটা পৃথক জাতি এবং পৃথক নির্বাচন ছাড়া ইসলাম বেঁচে থাকতে পারে না। ইসলামের এই নীতি উপেক্ষা করলে ইসলামের মূলে কুঠারাঘাত করা হবে। আমরা সারা দুনিয়ায় ৫০ কোটি মুসলমান বাস করি। পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সাড়ে চার কোটি লোক বাস করে। ইন্দোনেশিয়ার ৭ কোটি মুসলমান বাস করে। সেখানেও হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ প্রভৃতি জাতি রয়েছে। অথচ যুক্ত নির্বাচন প্রথা প্রচলিত। মিশরে মুসলমান ও খৃষ্টান আছে, সেখানেও যুক্ত নির্বাচন। লেবাননে ৩৫ লক্ষ মুসলমান রয়েছে সেখানেও যুক্ত নির্বাচন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট মুসলমান, সেখানেও যুক্ত নির্বাচন। ভারতে ৩ কোটি মুসলমান হিন্দুদের সঙ্গে ভোট দেয়, সেখানেও যুক্ত নির্বাচন। রাশিয়ায় মুসলমানরা যুক্ত নির্বাচন প্রথায় ভোট দেয়। দুনিয়ার সকল দেশে মানুষ যুক্ত নির্বাচন প্রথা অনুসারে ভোট দেয়। আমরা যুক্ত নির্বাচন প্রথায় ভোট দিলে কেন কাফের হয়ে যাব ?

পৃথক নির্বাচন প্রস্তাব যদি পাশ হয়ে যায়, আমরা দুনিয়ার সামনে হীন প্রতিপন্ন হয়ে যাব। আমার জনৈক বন্ধু বলেছেন, যখন আমরা ভারতবর্ষে ১০ কোটি মুসলমান ছিলাম, তখন আমরা দুই জাতির ভিত্তিতে পাকিস্তান পাই। ভাল কথা। যখন দেশ ভাগ হয়ে গেল, তখন ১০ কোটি মুসলমানের মধ্যে ৪ কোটি মুসলমানকে হিন্দুস্তানে ফেলে আসা হ’ল যারা জাতিত্বে বিশ্বাস করেন তারা কেমন করে ৪ কোটি হিন্দুস্তানে ফেলে আসলেন ? তাঁরা বেঈমানী করে ৪ কোটি মুসলমানকে হিন্দুস্তানে ফেলে আসেন নাই কি?
দুই জাতির ভিত্তিতেই যে পাকিস্তান এসেছে, তা নয়। এর পিছনে আর একটা জিনিষ ছিল। সেটা হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানের আর্থিক দুরবস্থা। এই আর্থিক দুরবস্থা হতে মুক্তি লাভের সংগ্রামের সঙ্গে ধর্মীয় আন্দোলন জড়িয়ে পড়ে। চার কোটি মুসলমান ভারতে যুক্ত নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে। আমরা এক জাতি দাবী করতে পারি, পৃথক নির্বাচন দাবী করতে পারি যদি ভারতের ৪ কোটি মুসলমানকে এখানে আনতে পারি। পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রে যুক্ত নির্বাচন আছে, তারা মুসলমান বলে গর্ব অনুভব করে; কিন্তু যুক্ত নির্বাচন প্রথায় ভোট দেয় বলে তারা অমুসলমান হয়ে যায়নি। ইসলামের নামে জনসাধারণকে ধোঁকা দেওয়ার বহু চেষ্টা অতীতে হয়েছে এবং দুনিয়ার বহু মুসলমান এর ফলে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে। এবং এরই ফলে মুসলমানরা ক্রমে ক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীর একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলি সম্পর্কেও একথা বটে।
তুরস্ক, মিশর, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লেবানন, ইন্দোনেশিয়া, এক কথায় সব কয়টি মুসলিম রাষ্ট্রে যুক্ত নির্বাচন প্রথা প্রচলিত। সে সকল দেশের মুসলমানদের কথা একবার চিন্তা করে দেখা উচিত। পাকিস্তানে কথায় কথায় ইসলামের দোহাই দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে মানুষের দুঃখের কোন সীমা নাই-মানুষ খেতে পায় না, পরতে পায় না, গৃহহারা, সর্বহারাÑ মিথ্যা, দুর্নীতি ইত্যাদি ব্যাপকভাবে চলছে। এগুলো নিশ্চয়ই ইসলাম সম্মত নয়। প্রকৃত ইসলাম হলো জুলুম থাকবে না, ঘুষ থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে নাÑসকল মানুষ খেতে পাবে, পরতে পাবে, শিক্ষা পাবে, থাকবার জায়গা পাবে, রোগে ঔষধ পাবে। নামই একমাত্র পরিচয় নয়। আমাকে কাজে দেখাতে হবে যে, আমি মুসলমান এবং ইসলাম আমার ধর্ম।
এই পরিষদে সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের ৭২ জন সদস্য আছেন। আমি জানতে চাই, যদি যুক্ত নির্বাচন প্রথা গ্রহণ করা না হয়, তা’হলে পাকিস্তানে একটা পরিষদে চলবে ? নিশ্চয়ই না। পাঁচটা পরিষদ করতে হবে। হিন্দু-মুসলমান জনসাধারণ এক সঙ্গে ভোট দিলে যদি অনৈসলামিক হয়, তা’হলে এই পরিষদে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান সদস্যগণ এক সঙ্গে ভোট দেন কেমন করে ? আমরা হিন্দু-মুসলমান সদস্যগণ এক সঙ্গে ভোট দিয়ে এই পরিষদের স্পীকার নির্বাচন করেছি, এক সাথে ভোট দিয়ে পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করেছি। আজ পর্যন্ত যত আইন পাশ করেছি, সবই হিন্দু-মুসলমান আমরা এক সঙ্গে ভোট দিয়ে করেছি। আমি জানতে চাই, এই সমস্তই কি ইসলাম বিরোধী হয়েছে ?
আমার দেশের লোক অশিক্ষিত হতে পারে কিন্তু তারা মূর্খ নয়। জনসাধারণ সবকিছু বুঝেই আজ যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে তাদের পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে। আমি বলতে চাই, এই পরিষদে আমরা বসে আইন পাশ করছিÑআমরা আলোচনা করছিÑহিন্দু মুসলমান ভোট দিচ্ছি-খৃষ্টান ভোট দিচ্ছেনÑবৌদ্ধ ভোট দিচ্ছেনÑএভাবে সকলের ভোটে আইন পাশ করছি। আমি জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছি, সকল স¤প্রদায়ের লোক এক সঙ্গে ভোট দিয়ে এই যে আইন পাশ করলাম সেটা কি ইসলামি আইন হলো না অনৈসলামিক আইন হল? আইনসভায় যদি হিন্দু-মুসলমান এক সঙ্গে বসে, এক সঙ্গে ভোট দিয়ে আইন পাশ করতে পারেন, তাহলে জনসাধারণ কেন এক সঙ্গে ভোট দিতে পারবেন না এবং কোন অপরাধে তাঁরা তা করতে পারবেন না?
যারা যুক্ত নির্বাচনের বিরুদ্ধে জেহাদ শুরু করেছেন, তাদের কাছেই বিশেষ করে মুসলিম লীগপন্থী বন্ধুদের কাছে জানতে চাই, এই যে সেদিন জাতীয় পরিষদের নির্বাচন হল পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার জনাব মোহাম্মদ আলী নির্দেশ দিয়েছিলেন নির্বাচন যুক্তভাবে হবে। এর ফলে পূর্ব বাংলার আমরা ৪০ জন হিন্দু মুসলমান সদস্য যুক্তভাবে নির্বাচিত হয়েছি। সেটা কি জায়েজ কি, না-জায়েজ কাজ হয়েছে ? তখন যদি জনাব মওলানা আতাহার আলী ঘোষণা করতেন যে, এটা ইসলাম, কোরান এবং হাদিসের বিরোধী কাজ তাতে তিনি শরীক হবেন না, তাহলে বুঝতাম যে, তাঁরা সত্যিকারের আদর্শ নিয়ে সংগ্রাম করছেন। মওলানা আতাহার আলী ও জনাব ফরিদ আহমদ আজও সেই জাতীয় পরিষদেরই সদস্য আছেন।
আমার দ্বিতীয় বক্তব্য বিষয় হচ্ছে, পৃথক নির্বাচন প্রথার যারা সমর্থক, হিন্দু-মুসলমানের এক সঙ্গে ভোট দিতে তাঁদের আপত্তি আছে। কিন্তু এক সঙ্গে মন্ত্রিত্ব করতে তাঁদের আপত্তি ছিল না। মিঃ অক্ষয় কুমার দাস ও মিঃ কামিনী কুমার দত্ত যে মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন যুক্ত নির্বাচন বিরোধী নিজামে ইসলামের জনাব নুরুল হক চৌধুরীও সেই মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। পূর্ব বাঙলায় মিঃ বসন্ত কুমার দাসের সঙ্গে নিজামে ইসলামের জনাব আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী এক সঙ্গে মন্ত্রিত্ব করেছেন। এক সঙ্গে হিন্দু-মুসলমানে শাসন করা জায়েজ কি, না-জায়েজ? একথার উত্তর তাঁরা দিবেন কি?
নিজেদের গরজের সময় তাঁদের দরকার হয় স্বতন্ত্র নির্বাচনের। আবার যখন গরজের তাগিদে অপরকে দলে টানার দরকার হয়ে পড়ে, তখন বলেন, যুক্ত নির্বাচন চাই। জনগণের সঙ্গে যাদের সংযোগ নাই যাঁরা জনসাধারণের সুখ, দুঃখের ভাগী হন না, যারা জনগণের রক্ত শোষণ করেন, যাঁরা সারা বছর আরাম কেদারায় বসে রাজনীতি আওড়ান এবং নির্বাচনের সময় ধর্মের ধ্বজা তুলে ধর্ম ভাঙ্গিয়ে সরলপ্রাণ জনসাধারণের ভোটে নির্বাচিত হতে চান, কেবলমাত্র তাঁরাই পৃথক নির্বাচনের সমর্থক। কিন্তু জনদরদী ও জনকল্যাণকামী কোন দল বা লোক পৃথক নির্বাচন চান না এবং চাইতেও পারেন না।
আমার এক বন্ধু বলেছেন, তাঁরা সংখ্যালঘুদের সমান চোখে দেখবেন। আমি জিজ্ঞাসা করি কিভাবে সমান চোখে দেখবেনÑ ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নাম বদলে দিয়ে? ইসলামিক প্রজাতন্ত্র না হয়ে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র নাম হোক আমরা তা নিয়ে জাতীয় পরিষদে অনেক লড়েছি। আমরা চেয়েছিলাম রাজনীতিক্ষেত্রে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সব সমান হোক, সত্য এবং সাম্যের নীতির উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক। যেখানে মিথ্যা, ঘুষ, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, অবিচার, অনাচার, অত্যাচার, দুর্ভিক্ষ চলছেÑ যেখানে মানুষ খেতে পায় না, পরতে পায় না, শিক্ষা পায় না, রোগে ঔষধ পায় না, থাকবার গৃহ পায় না, সেখানে ইসলাম কি করে থাকে? আর যদি দেখতে পেতাম, প্রত্যেক মানুষ সমানভাবে খেতে পাচ্ছে, শিক্ষা পাচ্ছে, বেইনসাফ নাই, অনাচার নাই, অত্যাচার নাই, মিথ্যা নাই, সেখানে নাম না থাকলেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হবে।
আমি আমার বন্ধুদের বুঝাতে চেষ্টা করছিলাম যে, সংখ্যালঘু, সংখ্যাগরিষ্ঠ, মোহাজের, আনসার, হিন্দু এবং মুসলমান এক কথায় মানুষ হিসাবে এদের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই। এ কথা সত্য যে, আমি মুসলমান হিসাবে আমার ধর্ম পালন করবো, যে হিন্দু সে হিন্দু হিসাবে তার ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টান তার ধর্ম পালন করবে। আজ পাকিস্তানে আইন করে যদি কোন কর ধার্য করা হয়, তাহলে সে কর হিন্দুকেও দিতে হবে, মুসলমানকেও দিতে হবে। চুরি যদি করে হিন্দুও করবে, মুসলমানও করবে, হিন্দু-মুসলমান উভয়ই বিচারে শাস্তি পাবে। গরীব হিন্দু-মুসলমান উভয়ই বিচারে শাস্তি পাবে। গরীব হিন্দু-মুসলমান না খেয়ে মরেÑ বড় লোক হিন্দুও আরাম করে, মুসলমানও আরাম করে। আমরা দুনিয়াকে দেখাতে চাই, পাকিস্তানের সাত কোটি হিন্দু-মুসলমান মিলে এমন রাষ্ট্র কায়েম করবো যেখানে থাকবে না ভেদাভেদ-সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু প্রশ্ন থাকবে না, মোহাজের, আনসার প্রশ্নও থাকবে না।
আমাদের বিবেচনা করা উচিত যে সাড়ে তিন কোটি মুসলমান যারা এই পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করেছে তারা আজও হিন্দুস্তানে পড়ে আছে। আমাদের দেখা উচিত যে ভারতের সা¤প্রদায়িক দলগুলি এমন ক্ষমতায় না আসে, যাতে তারা সেখানের মুসলমানদের উপর অত্যাচার করতে পারে। সেখানে যদি আজ হিন্দু-মহাসভা বলে যে, রাষ্ট্র প্রধান হিন্দু হবেন, সেখানে মুসলমান স্থান পাবে না, তাহলে পৃথিবীর ৫০ কোটি মুসলমানের বুক কেঁপে উঠবে। যদি আমরা হিন্দু সংখ্যালঘুদের সমানভাবে গ্রহণ করে নিতে পারি, তাহলে মিঃ নেহরু এবং মিঃ রাজেন্দ্র প্রসাদকে বলতে পারব, মুসলমানদের প্রতি সুবিচার করুন।
আমরা রাষ্ট্র প্রধান মুসলমান করলাম, পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নাম করলাম। এইভাবে দুই জাতি তো করেই দিলাম। তার উপরেও যদি স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথা প্রবর্তন করি, তাহলে কি হয়? দুই জাতি ভিত্তিতে আমাদের পাকিস্তান হয়েছে। এরপরও যদি আলোচনা করা হয় যে পাকিস্তানে আমরা দুই জাতি, একটা হিন্দু আর একটা মুসলমান, তাহলে একটা উত্তেজনার কারণ সৃষ্টি করা হয়। আজ যদি পূর্ব বাংলার কোটি হিন্দু বলে যে, তাদের আলাদা জায়গা অর্থাৎ একটা হিন্দু রাষ্ট্র দিতে হবে, তাহলে কী হবে? পাকিস্তানের খাতিরে ইনসাফের খাতিরে আমি আমার বন্ধুদের অনুরোধ করব, তাঁরা যেন স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথার প্রস্তাব প্রত্যাহার করেন। হিন্দুরা যদি যুক্ত নির্বাচন চায়, তাহলে মুসলমানদের আপত্তি করার কি আছে? আজ একজন লোক যদি তার অঞ্চলের গরীবের জন্য খাবার বন্টন করে, মিথ্যা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক আর খৃষ্টানই হোক সে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারবে। জনসাধারণ তাকেই ভোট দেবে। সেজন্য আমি বলছি, আজ যখন সংখ্যালঘু স¤প্রদায় যুক্ত নির্বাচন চায়, তখন মুসলমানদের আপত্তি থাকার কোন কারণ নাই। আজ মুসলমানরা যদি জনসংখ্যার শতকরা ৯০ জন হয়েও বলে যে, আমাদের রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন হওয়া উচিত, তাহলে দুনিয়ায় আর মুখ দেখানো যাবে না। ভারতে আমরা ৪০ কোটি লোকের মধ্যে মাত্র ১০ কোটি মুসলমান ছিলাম। সেখানে আমরা সংখ্যালঘু ছিলাম। সেজন্য আমরা স্বতন্ত্র নির্বাচন চেয়েছিলাম। আজ হিন্দুরা সংখ্যালঘু, তারা তাদের রক্ষার জন্য, তাদের অধিকার রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন চাইতে পারে। কিন্তু সংখ্যাগুরু হয়ে আমরা তা চাইতে পারি না। আমি চাই পাকিস্তান একটি জাতি হিসাবে গড়ে উঠবে, পাকিস্তানে পাঁচটি জাতি থাকবে না। পাকিস্তানে পাঁচটি জাতি হলে পাঁচটি পরিষদ করতে হবে, পাঁচ জন স্পীকার করতে হবে এবং ভোটাভুটি করে হিন্দুরা হিন্দু আইন, মুসলমানরা মুসলমান আইন, খৃষ্টানরা খৃষ্টান আইন, আর বৌদ্ধরা বৌদ্ধ আইন করবেন। আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে, আমরা মানুষ এবং আমরা জানি যে ইসলাম একথা বারবার বলছে এবং কোরান মজিদেও আছে যে মানুষের মঙ্গল কর। মানুষের মঙ্গল করতে হলে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থাকতে পারে না। তাই আমি বলি দেশের জন্য, পাকিস্তানের জন্য-যে পাকিস্তানকে আমরা সকলে ভালবাসি, পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিক ভালবাসে, সেই পাকিস্তানে যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। আমি বলতে চাই যুক্ত নির্বাচন দেশ, জাতি এবং পাকিস্তানের মঙ্গলই করবে, এতে অমঙ্গলের কিছু নাই।

[তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত এবং পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মুদ্রণালয়ে মুদ্রিত।]