মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দিন আহমদের অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত না হলে জাতিকে ইতিহাস বিকৃতির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে

1

প্রেসবিজ্ঞপ্তি।।  শুক্রবার ২৩ জুলাই বিকেল ৩টায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা ১৯৭৫-এর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী  উপলক্ষে এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্ব’। উক্ত ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি। ওয়েবিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অন্যতম রচয়িতা মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দিন আহমদের ছায়াসঙ্গী ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম।

উক্ত ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির। অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবেদ খান, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক শফিকুর রহমান এমপি, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি, মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা লেখক সিমিন হোসেন রিমি এমপি, জাগরণের যুগ্ম সম্পাদক শহীদসন্তান অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরী ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল। এ ছাড়া এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সহ অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্মূল কমিটির নেতৃবৃন্দ এই ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেছেন।

সভায় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির তার প্রারম্ভিক বক্তব্যে মহান নেতা তাজউদ্দিন আহমদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু না হলে বিশ্বের মানচিত্রে যেমন স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটতো না, একইভাবে তাঁর সুযোগ্য সহযোদ্ধা বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদের দক্ষ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছাড়া নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন সম্ভব হতো না। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে গঠিত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার চরিত্রগতভাবে রাষ্ট্রপতিশাসিত হলেও কার্যত এই সরকারের প্রধান নিয়ামক শক্তি এবং মূল নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা এনে দিয়েছে। একদিকে তিনি সরকারের ভেতর, দলের ভেতর, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক শক্তির ভেতর বিভিন্ন মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব দক্ষতার সঙ্গে নিরসন করেছেন, অন্যদিকে ভারতের সার্বিক সহযোগিতা সমমর্যাদার ভিত্তিতে নিশ্চিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা অর্জন করেছেন।

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, আমাদের চরম দুর্ভাগ্য হচ্ছেÑ বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদসহ বঙ্গবন্ধুর চার প্রধান সহযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, যারা বঙ্গবন্ধুর সরকারের ভেতরও সক্রিয় ছিল। এই অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুকে বহু ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে, যার ফলে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং এক পর্যায়ে সরকারি দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি নিতে হয়েছে। তাজউদ্দিন আহমদ নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি কতটা বিশ্বস্ত ও নিবেদিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাজউদ্দিন আহমদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃত না হলে জাতিকে ইতিহাস বিকৃতির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

প্রধান অতিথির ভাষণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দিন আহমদ যে শক্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বপ্রদানকারী সরকারের হাল ধরেছিলেন তা অতুলনীয়। তাজউদ্দিন আহমদ মুজিবনগরে সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করে প্রমাণ করেছেনÑ মুক্তিযুদ্ধ ছিল রাজনৈতিক যুদ্ধ। তিনি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও আদর্শ নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছিলেন। আমি ’৭২ সালে জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাকের মুক্তিযুদ্ধে চক্রান্তের বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাকের বিষয়ে ব্যবস্থা নিলে, আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীচক্র মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করত এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হত। জাতির জন্য দুর্ভাগ্য আমরা যেমন এখনও বঙ্গবন্ধুকে পরিপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি, সেরকম নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ তাজউদ্দিন আহমদকেও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। তাজউদ্দিন আহমদ আমাকে বলেছিলেন, মানুষকে রাজনৈতিকভাবে যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করা না হলে সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যার প্রমাণ ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা।

মুক্তিযোদ্ধা নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে সাধারণ মানুষের প্রতি তাজউদ্দিন আহমদের মমত্ববোধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আমরা কি নতুন প্রজন্মকে তাজউদ্দিন আহমদকে জানাতে পেরেছি? তাজউদ্দিন আহমদ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হত না।

মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, তাজউদ্দিন আহমদ সততা, নিষ্ঠা, ভালবাসা, দেশপ্রেম, বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিবেদিত এক প্রতিষ্ঠান। যাঁর কারণে বাংলাদেশ হতে পেরেছে। নিহত হবার পূর্বে আমার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই যেভাবে জীবনযাপন করেন সেভাবে প্রতিটি বাঙালি যদি জীবনযাপন করত তাহলে বাংলাদেশ অনেক উন্নত অবস্থায় যেতে পারত।’ তিনি বৈরি পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণভাবে সরকার, রাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদকে একে অপরের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া ও তাদের হত্যাকান্ড আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এই ক্ষতি পূরণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের নতুন প্রজন্মকে নতুনভাবে তৈরি হতে হবে। তাজউদ্দিন আহমদকে তাঁর কর্মের মধ্য দিয়েই আবিষ্কার করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক শফিকুর রহমান এমপি বলেন, তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্ব ছিল আপোষহীন ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন। তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মতবিরোধের পরও আমাদেরকে বলেছিলেন, আপনাদের কলম যেন সবসময় বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথা বলে।

তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা লেখক সিমিন হোসেন রিমি এমপি বলেন, তাজউদ্দিন আহমদ একজন নীরব কর্মী ছিলেন, যিনি নিজে প্রদীপের মতো জ্বলেছেন এবং বাংলাদেশকে সূর্যের আলোয় দীপ্ত করার চেষ্টা করে গেছেন অবিরাম। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর অফিস কক্ষে একটি চেয়ারে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি রেখেছিলেন, যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার সকল কাজের প্রেরণা। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী।

সভায় বক্তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাজউদ্দিন আহমদের বিশাল অবদান সঠিকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর জীবনী সকল মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।