মালুম ভাই : আপনাকে কি ভোলা যায়

34

 রানা দাশগুপ্ত

এ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম-আমাদের ‘মালুম ভাই’। আমরা যাঁরা তাঁর কাছের জন এভাবেই তাঁকে সম্বোধন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। তিনি আজ কবরে শায়িত। শেষ শয্যার আগে পাওয়া তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার আপামর দেশবাসীকে জানান দিয়ে গেছে তিনি এদেশের একজন সাহসী সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা।

জাতি এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন অনেকে। সে অর্থে অনেকে হয়তো ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ সম্মান পেয়েছেন। পাবেন, অনেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন বীরত্বের খেতাবও পেয়েছেন। কিন্তু আজকের দিনে এসে ভাবতে ইচ্ছে করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ক’জন। ‘আজন্ম মুক্তিযোদ্ধা’-র সৌভাগ্য নিয়ে আপামর বাঙালির অফুরাণ ভালোবাসায় পরপারে যাচ্ছেন যাঁরা তাঁদের হাতে গুণে দেখবার সময় এসেছে।

মাত্র ৬৭ বছরের জীবনে হারিয়ে গেলেন মালুম ভাই। সে-ই কৈশোরে স্কুলের গন্ডি না পেরোতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ছাত্রজীবনের সূচনায় বামপন্থার ছাত্র রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি ঐক্য, শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি-র মহতি শ্লোগানকে ধারণ করে। ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুুদ্ধ হয়ে তিনি সমাজ প্রগতির সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যৌবনের সূচনায় কমিউনিস্ট পার্টির একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ‘জীবন মরণ পণ করি এসো এবার দেশ গড়ি’ এ শ্লোগানে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও কৃষক ও ক্ষেত মজুরের সংগঠন গড়ে তোলার জন্যে গ্রাম বাংলার নানান জনপদে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কৃষকসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন। পেশাগত জীবনে তিনি মানবাধিকার বিশেষ করে নারীদের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একজন আন্তরিক শুভানুধ্যায়ী ও সাথী হিসেবে পথচলার চেষ্টা করেছেন। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজের অর্গল ডিঙিয়ে তিনি স্বাধীনতার ইশতেহারে বর্ণিত সাম্য, সমতা ও সামাজিক মর্যাদার অঙ্গীকার নিশ্চিতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির উপর অব্যাহত চাপ রাখার প্রয়াসে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

২০০৭ সালের কোন একদিন ঢাকার ধানমন্ডির বিলিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত ‘যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ বিষয়ক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে মালুম ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা। তাঁর পাশেই বসা থাকাবস্থায় কিভাবে তিনি যেন আমাকে চিনতে পেরে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে করমর্দন করে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে নীচু স্বরে বলেছিলেন ‘আমি মালুম’। নাম শুনেই আমার মনে হলো শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের অন্যতম নিষ্ঠাবান কর্মী সংগঠক হিসেবে যে ‘মালুম’ নামটির সাথে আমার পরিচয় এ-ই সেই ‘মালুম’। মুহুর্তের পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হতে খুব বেশী সময়ের প্রয়োজন পড়েনি। এর পরে অনেকদিন আর দেখা হয়নি।

২০১০ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝির শেষ দিক। আমি তখন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আয়োজিত এক কনভেনশনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। এখানে অবস্থানকালীন একদিন হঠাৎ ভারী গলায় মালুম ভাই নিজেই নিজের পরিচয় দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, জেনেভা থেকে আমি কবে ঢাকা ফিরছি। ঢাকায় ফিরেই আমি যাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ইতোমধ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কক্ষে গিয়ে বিজ্ঞ মুখ্য প্রসিকিউটর প্রবীণ আইনজীবী এ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু সাহেবের সাথে দেখা করি। এর কয়েকদিনের মধ্যে ঢাকায় ফিরে তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে এসে অনেক দিন পর মালুম ভাইয়ের দেখা পেলাম। তিনি আমাকে সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনজীবী টিপু সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে বিজ্ঞ চীফ প্রসিকিউটর সাহেব আমাকে তাঁর গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যান সচিবালয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমদ সাহেবের কাছে। তিনি আমাকে তার পরদিন অতিরিক্ত এ্যাটর্নী জেনারেলের পদ মর্যাদায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে যোগদেয়ার অনুরোধ জানালে আমি যথারীতি ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি এতে যোগ দিই। যোগ দেয়ার সময়ে আমার মনে হয়েছে, যৌবনের সূচনায় ১৯৭১ সালে আমি সেদিনকার রণাঙ্গনে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অংশ নিয়েছি, বার্ধক্য থেকে প্রৌঢ়ত্বের যুগ সন্ধিক্ষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কাজ’ সম্পাদনের সুযোগ দিয়েছেন। নিজেকে এজন্যে গৌরবান্বিতও মনে হলো।

সেদিন থেকে মালুম ভাইয়ের চিরবিদায়ের দিন পর্যন্ত আমি তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠজন। বয়সে আমার থেকে অন্ততঃ ৫ বছরের ছোট হওয়ায় বড় ভাই হিসেবেও যথাযথ সম্মান দিতে তিনি ভোলেননি। যতই তাঁর সান্নিধ্যে গেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি তাঁর বন্ধুবৎসল আচরণে, সম্ভাষণে, আন্তরিকতায়, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সূচনা থেকে চীফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একাগ্রতা, দায়বদ্ধতা থেকে তাঁকে এজন্যে চিন্তা ও শ্রম দিতে দেখেছি ট্রাইব্যূনালের বিচার প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনার জন্যে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ঘনিষ্ঠজনের বিরূপতা হাসিমুখে তাঁকে উপেক্ষা করতেও দেখেছি। ৭১-র মুক্তিযুদ্ধ ও ৭৫-র বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে দৃঢ় অবস্থানের জন্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অধিনায়ক বীরউত্তম আবদুল কাদের সিদ্দিকীকে বাঙালি জাতি সপ্রশংসায় স্মরণ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ চলাকালে হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডিত আলবদর বাহিনীর উপ-অধিনায়ক মীর কাশেম আলীর মালিকানাধীন দিগন্ত টেলিভিশনে বিচারবিরোধী তাঁর অবস্থান গোটা জাতিকে বিস্মিত ও হতবাক করেছে। অনেকের বুঝে নিতে কষ্ট হয়েছে এ ভেবে যে কি করে তা’ সম্ভব। মালুম ভাই তাঁর একান্ত স্বজনের এহেন ভূমিকাকে সেদিন কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ একদিন এক কলামে জনাব কাদের সিদ্দিকী মালুম ভাইয়ের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার-ই শুধু নয় মুক্তিযুদ্ধে মালুম ভাইয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন।

এমনকি বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে প্রচুর অর্থ বিত্তের দুর্নীতির মধ্য দিয়ে মালুম ভাইয়ের মালিক হওয়ার মিথ্যা অভিযোগও তুলতে তাঁর বিবেকে বাধেনি। এ নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশের জন্যে মালুম ভাইয়ের অনুরোধে সেদিনকার লেখাকে চ্যালেঞ্জ করে এক আইনী নোটিশও আবদুল কাদের সিদ্দির্কী বীরউত্তমের বরাবরে আমার স্বাক্ষরে প্রেরণ করতে হয়েছে, যা কখনো মুহুর্তের জন্যেও ভাবতে পারিনি। সেদিন আমার কাছে দুঃখের সাথে মনে হয়েছে, ৭১-র রাজাকার সব সময়ের রাজাকার। কিন্তু ৭১-র মুক্তিযোদ্ধা, ব্যতিক্রমবাদে, সর্বকালের মুক্তিযোদ্ধা নন।

মালুম ভাই আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে ‘সর্বকালের মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নয়, দেশ ও জাতিরও অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে-নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়।