ভুমি আইনের খসড়া প্রত্যাহার চান বিশিষ্টজনেরা

11

আইন কমিশন প্রণীত ভূমি আইনের খসড়া দেশের প্রচলিত অন্যান্য আইন, সংবিধান ও মানুষের জমির ন্যায্য অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীসহ দেশের বিশিষ্ট আইনজীবীরা। তাঁরা বলেছেন, খসড়াটি সংশোধনেরও অযোগ্য, তাই এটি প্রত্যাহার করতে হবে। এরপর প্রয়োজনে গণতান্ত্রিক উপায়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

শনিবার (৯ জানুয়ারি)  বিকেলে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) আয়োজিত ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলে বিশিষ্টজনদের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। গোলটেবিলটির সম্প্রচার সহযোগী ছিল প্রথম আলো। ভূমি আইনের খসড়াটি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইন কমিশনের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হয়, যাতে বিভিন্ন জন এ ব্যাপারে মতামত দিতে পারেন। খসড়াটি পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যেই শনিবার গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়েছিল।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, ভূমি আইনের বর্তমান খসড়াটি আইনে পরিণত করা হলে দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা খর্ব হবে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব বাড়বে, এতে ভূমিসংক্রান্ত মামলার জট আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

আইন কমিশনের এমন খসড়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে সুলতানা কামাল বলেন, খসড়াটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দেশের প্রত্যেক মানুষের ওপর ভূমি আইনের প্রভাব পড়ে বলে জানান বিচারপতি ও ব্লাস্টের প্রধান আইন উপদেষ্টা মোহাম্মদ নিজামুল হক। তাই খসড়াটি নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইন কমিশন তাদের মত (খসড়ার মাধ্যমে) তুলে ধরেছে, এখন অন্যদের উচিত তাদের মতামত ও আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরা।

গোলটেবিলে সভাপতিত্ব করেন এএলআরডির চেয়ারপারসন ও বেসরকারি সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির। তিনি বলেন, ঢালাওভাবে অগণতান্ত্রিক উপায়ে খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে। এটি তুঘলকি কায়দায় মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা, নিঃস্ব করার প্রক্রিয়া। কোনো মতেই এ দেশের মানুষ খসড়াটি গ্রহণ করবে না। গ্রহণ না করার পেছনের যুক্তি ও কারণগুলো আইন কমিশনের সামনে তুলে ধরতে হবে।

‘ভূমি আইন ২০২০ (খসড়া): পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি ভূমি আইনের খসড়াটি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভূমি আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, পর্যালোচনার প্রয়োজন। যাতে এমন আইনের মাধ্যমে মানুষের ভূমি ভোগদখলের ন্যায্য ও মানবিক অধিকার বাস্তবায়ন হয়।

গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী। তিনি আইনের খসড়ার দুর্বল ও নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, ভূমি আইনের খসড়াটি তৈরির দৃষ্টিভঙ্গিই ভুল ছিল। খসড়াটিকে মানুষের ভূমির অধিকার লাভের অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন তিনি।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ভূমি আইনের খসড়াটি কার্যকর হলে অর্পিত সম্পত্তি  প্রত্যর্পণ আইন ও ‘দ্য স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট’ বাতিল হয়ে যাবে। খসড়া অনুযায়ী, আইনটি দেশের সব এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে। এতে পার্বত্য চুক্তির আওতায় যে আইনগুলো হয়েছে, সেগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে। তিনি ভূমি আইনের খসড়াটি প্রত্যাহারের দাবি জানান।

খসড়া আইনটি কার্যকর হলে দেওয়ানি আদালত একেবারে অকার্যকর হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

ভূমি আইনের খসড়াটি কার্যকর হলে প্রচলিত ২২টি আইন বাতিল হয়ে যাবে বলে জানান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, যেসব আইনের মাধ্যমে, আদালতের রায়ের মাধ্যমে মানুষ সুফল পাচ্ছে, সেগুলো বাতিল করে নতুন আইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংশোধনের সুপারিশের জন্যও প্রস্তাবিত খসড়াটিকে বিবেচনায় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তবারক হোসেন।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজল দেবনাথ। তিনি বলেন, ভূমি আইনে এমন কোনো কিছু করা উচিত হবে না, যাতে বিচার বিভাগকে বাদ দিয়ে প্রশাসনকে ষোলো আনা ক্ষমতা দেওয়া হয়। তিনি জমির দলিল ডিজিটাল (প্রযুক্তিনির্ভর) করার পক্ষে মত দেন, যাতে জাল দলিল তৈরি করা বন্ধ হয়।