ভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে অব্যাহত অপপ্রচার ও ভুয়া পোস্টে ধর্ম অবমাননার জিগির ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে Ñ সংবাদ সম্মেলনে রানা দাশগুপ্ত

52

চট্টগ্রাম, ০৩ নভেম্বর।। চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত দেশে বিরাজমান সংখ্যালঘু পরিস্থিতি তুলে ধরে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, একদিকে সামাজিক গণমাধ্যমে ভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে অব্যাহত অবমাননাকর অপপ্রচার, অন্যদিকে ফেইসবুক আইডি হ্যাক করে সাম্প্রতিককালে ভুয়া পোস্ট প্রদানের মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার জিগির তুলে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। আমরা মনে করি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার কু-অভিপ্রায়ে সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষের এ এক পরিকল্পিত ঘৃণ্য অভিসন্ধি। অনতিবিলম্বে সরকার এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আজ সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যে তিনি পরিসংখ্যানসহ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে এর প্রতিবাদে সারাদেশে গণঅবস্থান ও অবস্থান শেষে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ঢাকায় এ কর্মসূচি পালিত হবে শাহবাগ চত্বরে আর চট্টগ্রামে নিউমার্কেট চত্বরে।
লিখিত বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ নি¤েœ দেওয়া হলোÑ
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা আমার আন্তরিক অভিবাদন গ্রহণ করবেন। আজ জেল হত্যা দিবসে জাতীয় চার নেতার প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় জীবনের বিশেষ এক পরিস্থিতিতে আবারো আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি বিদ্যমান সংখ্যালঘু পরিস্থিতি তুলে ধরবার জন্যে। আমাদের আহŸানে সাড়া দিয়ে আপনারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তজ্জন্যে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
প্রিয় ভায়েরা ও বোনেরা,
আমরা ভেবেছিলাম, করোনাভাইরাস অতিমারী সমাজকে অনেক বেশী মানবিক করবে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়, বিগত ৮ মার্চের পর থেকে এ সময়কাল পর্যন্ত, দেখে শুনে মনে হয়, ব্যতিক্রমবাদে সমাজের মানবিকতা অনেক বেশী নি¤œগামী হচ্ছে। একদিকে নারী, আরেকদিকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মকে হেয় করে, তাদের ধর্মানুভূতিতে প্রতিনিয়ত আঘাত করে নানান অপপ্রচার বল্গাহীনভাবে চালানো হচ্ছে। শুধু কি তা-ই, রাষ্ট্র যখন সরকারি নানান সংস্থায় নিয়োগ, পদোন্নতিতে নাগরিকদের ধর্ম বিবেচনায় নয়, মেধা ও যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেয়ার চেষ্টা করতে শুরু করেছে তখন সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষ এর বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে নানান আজগুবি পরিসংখ্যান প্রচার করে। এখনও বলা হচ্ছে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত থেকে ২ লক্ষ হিন্দু বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিয়েছে। আর ভারতীয় হাই কমিশনের তত্ত¡াবধানে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর ইঙ্গিতে এরা সরকার, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর নানান গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঠাঁই করে নিয়েছে। ‘দেশপ্রেমিক’ লোকজন হয় ওএসডি নয়তো বা চাকুরিতে ঢ়ুকতে পারছে না ইত্যাদি। অপপ্রচারকারীদের কেউ কেউ অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়েও বল্গাহীন মিথ্যাচার করে চলেছে। লক্ষ্যণীয়, সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু, ভারত ও বর্তমান সরকারকে একাকার করে সাম্প্রদায়িক প্রচার, প্ররোচনা এরা অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সাম্প্রদায়িকতাকে অনেক বেশী প্রোথিত করে চলেছে ওরা ঠিক পাকিস্তানি আমলের মতো-ই। অথচ সরকার, প্রশাসন এক্ষেত্রে রহস্যজনক নীরবতা পালন করে চলেছে। এহেন সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমরা শংকিত ও উদ্বিগ্ন।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
ধর্ম-সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাঙালি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্যে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট- পরবর্তীতে আমরা রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক- এ তিন ধরণের সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছি। ১৯৯০, ১৯৯১, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা আমরা ভুলিনি। ২০০৮- পরবর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতাকে পেছনে ফেলে এগুনোর চেষ্টা করলেও ২০১১ থেকে অদ্যাবধি চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি আমরা। ফেইসবুক হ্যাক করে, বা ভুয়া স্ক্রিনশট তৈরি করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব রটিয়ে কক্সবাজার-রামু-উখিয়া টেকনাফের সাম্প্রদায়িক ধ্বংসলীলা থেকে পাবনার সাঁথিয়া, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, ভোলার বোরহানউদ্দীনের ধ্বংসলীলা বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছিল তা আমরা জানি এসব দুষ্কর্মের জন্য দায়ী যারা তারা আজো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কেউ কেউ বিচারের মুখোমুখি হলেও তা অনেকটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শাহাবউদ্দিন কমিশন, যা গঠিত হয়েছিল ২০০১-২০০৬ সালের রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার সাথে যারা জড়িত তাদের সনাক্ত করার জন্যে, সুপারিশ সম্বলিত রিপোর্ট পেশ করেছিল ২০১১ সালের শেষের দিকে। আজ ৯ বছর শেষ হতে চলেছে। এর সুপারিশ বাস্তবায়ন দূরে থাকুক, রিপোর্ট এখনো আলোর মুখ দেখলো না-এটি রহস্যজনক। আজকের এ সংবাদ সম্মেলন থেকে আমরা আবারও শাহাবউদ্দিন কমিশনের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ ও এর সুপারিশবলী দ্রæততম সময়ে বাস্তবায়নের দাবি জানাই।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
চলতি বছরে (২০২০ সালে) করোনাভাইরাস সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ মহামারীতেও ধর্মীয়-জাতিগত-সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস পূর্বেকার মতো অব্যাহত রয়েছে। এসব সন্ত্রাসের কোন কোনটির সাথে সন্ত্রাসীরা সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র নেতা-কর্মীর পরিচয় দিয়েছে। বিগত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর-এ ৭ মাসের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের চালচিত্র নি¤œরূপঃ
হত্যার শিকার- ১৭ জন, হত্যাচেষ্টার শিকার- ১০ জন, হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে- ১১ জনকে, ধর্ষণের/গণধর্ষণের/নির্যাতনের শিকার- ৩০ জন, ধর্ষণের চেষ্টা- ৬ জনকে, শ্লীলতাহানীর কারণে আত্মহত্যা- ৩ জন, জোরপূর্বক অপহরণের শিকার- ২৩ জন, অপহরণের চেষ্টা- ২ জনকে, নিখোঁজ- ৩ জন, প্রতিমা ভাংচুর- ২৭টি, মন্দিরে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা- ২৩টি, শ্মশান/ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি দখলের ঘটনা- ৫টি, বসতভিটি, জমিজমা, শ্মশান থেকে উচ্ছেদের ঘটনা- ২৬টি, বসতভিটি, জমিজমা, শ্মশান থেকে উচ্ছেদের অপপ্রয়াসের ঘটনা- ৭৩টি, দেশত্যাগের হুমকি দেয়া হয়েছে- ৩৪ জনকে, গ্রামছাড়া করা হয়েছে- ৬০টি পরিবারকে, ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য হুমকি- ৪ জনকে, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ- ৭ জনকে, বসত-ভিটা/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনা- ৮৮টি, দৈহিক হামলায় গুরুতর জখম- ২৪৭ জন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ত্রাণ বিতরণকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহŸান জানানো হয়েছে- ২০টি পরিবারকে, মহানবীকে কটুক্তির মিথ্যা অভিযোগে আটক- ৪ জন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নিজস্ব সূত্র, বাংলাদেশ মাইনোরিটি ওয়াচ ও শীর্ষ গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিগত সাত মাসের করোনাকালীন সময়ের এই সাম্প্রদায়িক চালচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে বলতে চাই এ চালচিত্র সম্পূর্ণ চালচিত্র নয়, সমগ্র ঘটনার অংশবিশেষ মাত্র। আসলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাংলাদেশে নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো- ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভয়ে ভীত করে উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা, যাতে দেশটি সংখ্যালঘুশূণ্যে পরিণত হয়। পাকিস্তানি আমলের সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষের এ ঘৃণ্য চক্রান্ত স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত রয়েছে। এ চেষ্টা ফলপ্রসূ হলে দেশ ও জাতি গভীর সংকটে নিপতিত হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
সাংবাদিক ভায়েরা ও বোনেরা,
বিগত রমজান মাসের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদত্ত কতেক বিজ্ঞাপনের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যাতে লেখা আছে- ‘পবিত্র মাহে রমযান উপলক্ষে অনলাইন-এ বিশেষ আয়োজন, ২০ দিনব্যাপী অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াহ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স, সময়: সকাল ১১.০০ থেকে ১২.০০ পর্যন্ত। তারিখ: ২৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত। রমযান: ১ রমযান থেকে ২০ রমযান পর্যন্ত।’ এতে আরো লিপি আছে- ‘অমুসলিমগণ আল্লাহ্ তা’আলার বান্দা। প্রিয় নবীজীর উম্মত। তারা প্রতি মুহূর্তে চিরস্থায়ী জাহান্নামে ঝাঁপ দিচ্ছে। খ্রিস্টান মিশনারীরা মুসলমানদের দাওয়াত দিয়ে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কে বাঁচাবে তাদেরকে? কোন নবী-রসূল আর আসবেন কি ? আসবেন না। তাই নবীওয়ালা যিম্মাদারী নিয়ে আমাদেরকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে তাদেরকে বাঁচাতে। দ্বীন ও মুসলিম উম্মাহর এই অনিবার্য প্রয়োজন পূরণের লক্ষে আমাদের এই আয়োজন। প্রশিক্ষণের বিষয়: * হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি। * খ্রিস্টান ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি। * মুরতাদ ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি। * অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর। তথ্যসূত্র: কুরআন, হাদীস, বাইবেল, কিতাবুল মোকাদ্দাস, বেদ, পুরাণ, উপনিষদ। ক্লাস: সরাসরি ফেইসবুক আইডি থেকে লাইভ দেওয়া হবে। কোর্স সংক্রান্ত তথ্য জানতে যোগাযোগ- ০১৭২৬-০৫১৮০১। আলোচক: মুফতি যুবায়ের আহমদ সাহেব, পরিচালক, ইসলামী দাওয়াহ্ ইনস্টিটিউট, বিশিষ্ট দা’য়ী, লেখক ও গবেষক। বিষয়: দাওয়াতের কর্মপদ্ধতি ও দা’য়ীর গুণাবলী। তারিখ: ১১-০৫-২০২০, সময়: সকাল ১১টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত। ইসলামী অনলাইন দাওয়াহ্ বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। ফেইসবুক: রংষধসরপড়হষরহবফধধিয ও রংষধসরপড়হষরহবফধধিয.নফ
আরেকটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, মান্ডা শেষ মাথা, মুগদা, ঢাকা- ১২১৪ এ ঠিকানায় স্থাপিত ‘ইসলামী দাওয়াহ ইনস্টিটিউট (দাওয়াহ বিষয়ক গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)-র নামে উপরে উল্লেখিত বিষয়সমূহ নিয়ে অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াহ প্রশিক্ষণ কোর্সে গত ০৮ শাওয়াল থেকে ১ বছরব্যাপী ভর্তি চলছে উল্লেখ রয়েছে। এ বিজ্ঞাপন অনুযায়ী উপরোক্ত মুফতি যুবায়ের আহমদ এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক।
এমনতরো আরেকটি বিজ্ঞাপনে ‘নিউ মুসলিম ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন (এনএমডিএ) নামীয় একটি প্রতিষ্ঠানের, যার অফিস: হাউজ নং-২৯/এ, রোড নং-০৮ (মেইন রোড), মোহাম্মদি হাউজিং