বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

17

রাজধানীর কোতোয়ালি এলাকার এক সোনা ব্যবসায়ীর ওপর ভয়াবহ পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী রাজিব কর রাজুর অভিযোগ, তাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। থানার এসআই মিজানুর রহমান, এসআই আবদুল জলিল ও এএসআই ফরিদ ভূঁইয়া শুরু করেন নির্মম নির্যাতন। তার এক হাত ভেঙে যায়। একপর্যায়ে রাজিবের হাতের নখ উপড়ে ফেলেন এসআই মিজানুর রহমান। তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ২৮ ভরি সাড়ে ১১ আনা সোনা, নগদ ২ লাখ ৪১ হাজার ৩শ টাকা। দৈনিক আমাদের সময়-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ করেন রাজু। তদন্তে নেমে ঘটনার সত্যতা পায় পুলিশ সদর দপ্তরও। পুলিশের তদন্তেও উঠে আসে ঘটনার সত্যতা। কিন্তু এখনো বিচার হয়নি অভিযুক্ত তিন পুলিশ কর্মকর্তার।

সোনা ব্যবসায়ী রাজিব কর রাজু জানান, তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানার চৈনপুরে। ঢাকার কোতোয়ালি থানার গোয়ালনগরের ৬৯ নম্বর বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তাঁতীবাজার থেকে সোনার গহনা কিনে গ্রামের বাড়ির সোনার দোকানে পাইকারি বিক্রি করতেন। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ২৮ ভরি সাড়ে ১১ আনা সোনার গহনা কেনেন। আর তার কাছে ছিল ৪১ হাজার ৩শ টাকা ছিল। ওইদিন রাত আড়াইটার দিকে এসআই মিজান ও এএসআই ফরিদ দরজা ভেঙে তার তাঁতীবাজারের বাসায় ঢোকেন। হাতকড়া পরিয়ে বাসা তল্লাশি করে সোনা, নগদ টাকা, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যান। তাকে চোখ বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সারারাত অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে রাজু জানান, পরদিন ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজুকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থানায় এনে দ্বিতীয় দফায় নির্যাতন করে এসআই জলিল। হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়। বাম হাত ভেঙে দেওয়া হয়। বাম পায়ে প্রচন্ড আঘাত দিয়ে অচল করে ফেলা হয়। এরপর ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিলে ছেড়ে দেওয়া হবে, না দিলে মাদক মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়। খবর পেয়ে রাজুর বড় ভাই আশিষ কর এসআই মিজানের হাতে ২ লাখ টাকা তুলে দেন। পরে ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে সাদা কাগজে নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে রাখেন। এরপর পুলিশ হুমকি দিয়ে বলে, তুই যদি মুখ খুলিস এবং তোকে যদি তাঁতীবাজার এলাকায় দেখতে পাই তবে মেরে ফেলব।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে রাজু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন। পরে ডিসি লালবাগ ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান রাজুর কাছে। এর দুদিন পর পুলিশ সদর দপ্তরের এএসপি মামুন আল রশিদ রাজুকে ফোন দিয়ে জানান, প্রধানমন্ত্রী আপনার অভিযোগ পেয়েছেন। তিনি আইজিপিকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পরে এএসপি মামুনের তদন্ত টিম রাজুর গ্রামের বাড়িতে যায়। সবার সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করে। পরে রাজুকেও পুলিশ সদর দপ্তরে ডাকা হয়। পুলিশের তদন্ত কমিটি রাজুকে দুঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরবর্তী সময়ে এএসপি মামুন রাজুকে ফোন করে বলেন, ওই তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পুলিশের ওই তিন সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে।

এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, তদন্তের অংশ হিসেবে রাজুকে একাধিকবার ডিবি কার্যালয়ে ডাকা হয়। ডিবিতে অভিযুক্ত এসআই মিজান ও এসআই জলিল রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদও করেন। রাজুর পরিবারকেও ডিবি কার্যালয়ে এনে সাক্ষ্য নেওয়া হয়। রাজুর অভিযোগ, ডিবি কার্যালয়ের বাইরে রাজুসহ তার পরিবারকে মামলা তুলে নিতে এবং বিষয়টি সমাধান করতে বলেন এসআই জলিল ও মিজান। এরপর রাজুসহ তার পরিবার গ্রামে চলে যান।

আমাদের সময় জানায়, এসআই জলিল রাজুকে ফোন করে সমঝোতার কথা বলেন। এরপর ডিএমপির শ্যামপুর জোনের এসি শাহ আলম ফোনে রাজুকে ঢাকায় আসতে বলেন। সেখানে এসি শাহ আলমের সামনে এএসআই ফরিদ জেরা করেন রাজুকে এবং সমঝোতার প্রস্তাব দেন। কিছুদিন পর ডিএমপির এডিসি (মিডিয়া) আবু আশরাফ সিদ্দিকী রাজুকে তার পরিবারসহ ডেকে পাঠান। কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমানও সেখানে এসে রাজুকে জেরা করেন। একপর্যায়ে ওসি রাজুকে বলেন, এ ঘটনা থেকে আমাকে বাঁচান।

কিন্তু এত কিছুর পরও রাজু হাল ছাড়েননি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় চলতি বছরের ৮ মার্চ আইজিপিস কমপ্লেইন্টস মনিটরিং সেলে অভিযোগ করেন রাজু। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরের এএসপি মামুন রাজুকে ফের ফোন করে বলেন, তুমি চার লাখ টাকায় সমাধান করতে পারতে। কিন্তু তা না করে তুমি আরও ঝামেলা করছ।

রাজু অভিযোগ করেন, রাজুর সাক্ষী মিলন রায়ের বাসায় অভিযুক্ত এসআই মিজান একাধিকবার গিয়ে জীবননাশের হুমকি দেন। তারা বলেন, আমার কথামতো সাক্ষ্য দিলে তুইও বেঁচে যাবি, আমরাও বেঁচে যাব।

এমন অবস্থায় নিরাপত্তাহীন জীবন পার করছেন রাজু। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমি অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার চাই। এ ছাড়া আমার যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সেটা ফিরে চাই। আমি কারও করুণা চাইছি না।’

এ বিষয়ে বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ সদর দপ্তরের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড শাখার এএসপি মামুন আল রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘অনেক আগে তদন্ত করেছিলাম। আমার সবকিছু মনে নেই। তদন্তে ফল কী এসেছিল তা রাজু জানেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আমাদের সময় থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোতোয়ালি থানার এসআই মিজানুর রহমান ও এসআই আব্দুল জলিলকে পাওয়া যায়নি। তাদের মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। এ ছাড়া অভিযুক্ত এএসআই ফরিদ ভূঁইয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।