বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায়

34

বিশেষ প্রতিনিধি।।  বাংলাদেশ-ভারত প্রথম মৈত্রী সেতু এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। ফেনী নদীর এপারে রামগড় এবং ওপারে ভারতের ত্রিপুরার সাব্রুমকে যুক্ত করেছে এই সেতু। সেখানে রামগড় স্থলবন্দর চালু হওয়া কেবলই সময়ের ব্যাপার, যা হবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাতরাজ্যের দরজা। কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং মীরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ভারতের শিল্পাঞ্চল। ফলে এই বন্দরটি দেশের অন্যতম ব্যস্ততম স্থলবন্দরে রূপ নেবে, এমনই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।  খুলে যাবে ব্যবসা বাণিজ্য এবং পর্যটনে অপার সম্ভাবনার দরজা। আগামি ২৬ মার্চ এই সেতু উদ্বোধন করার কথা। এর আগে ১৬ মার্চ দু’দেশের পানি সম্পদ সচিব পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

খাগড়াছড়ির রামগড়ে চালুর অপেক্ষায় থাকা এ বন্দর বাংলাদেশের পঞ্চদশ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রথম স্থলবন্দর। দু’পারেই অধীর অপেক্ষা, কবে খুলছে এই প্রবেশদ্বার। সাধারণ মানুষের আশা, অধিবাসীদের কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে এ বন্দর। তাই স্বাভাবিকভাবে ক্রমেই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে রামগড় স্থলবন্দর। ভারতের সেভেন সিস্টারস-খ্যাত সাত রাজ্যের মানুষ মুখিয়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা গ্রহণ এবং সাগরের খোলা হাওয়ায় বুকভরা শ্বাস নিতে। চট্টগ্রামের বারৈয়ারহাট থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ রামগড়। সেখানেই নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১। ২০১৭ সালের নবেম্বর মাসে শুরু হওয়া সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল দু’বছরের মধ্যে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তা বিলম্বিত হয়। তবে গত জানুয়ারি মাসে সেতুর নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। দৃষ্টিনন্দন এ সেতু দেখতে প্রতিদিনই দু’পারে ভিড় উভয় দেশের মানুষের। অচিরেই খুলে যাবে এই পথ। নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দু’দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা একাধিকবার সেতু পরিদর্শন করে গেছেন। এখন দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচি অনুযায়ী যে কোন সময়ে তা উন্মুক্ত হবে যানবাহন চলাচলের জন্য। আপাতত জানা যাচ্ছে উদ্বোধন হচ্ছে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে। সম্পূর্ণ ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত এ সেতুতে ব্যয় হয়েছ ৮২ দশমিক ৫৭ কোটি রুপি। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪১২ মিটার এবং প্রস্থ ১৪ দশমিক ৮০ মিটার। দুই লেন বিশিষ্ট এক্সট্রা ডোজড ক্যাবল স্টেইট আরসিসি সেতু এটি। দৈর্ঘ্যে খুব বেশি না হলেও গুরুত্বে অনেক বড়। কারণ, এ সেতুর ওপর দিয়েই চলাচল করবে আমদানি রফতানির পণ্যবাহী যানবাহন। শুধুমাত্র ত্রিপুরা রাজ্যই নয়, অসম, মনিপুর, মিজোরাম, মেঘালয়, অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডসহ সাত রাজ্যের দরজা হতে যাচ্ছে এ স্থলবন্দর। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সরকারই এই স্থলবন্দর এবং কানেক্টিভিটিকে দেখছে উইন উইন হিসেবে। কেননা, এ পথে ভারত যেমন বন্দর সুবিধা পাবে তেমনিভাবে বাংলাদেশও পাবে ভারতে প্রবেশের আরেকটি সুবিধা। চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুন্ড ও ফেনীর সোনাগাজীতে তৈরি হচ্ছে প্রায় ত্রিশ হাজার একর ভূমি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী। সেখানে প্রায় এক হাজার একর ভূমিতে হচ্ছে ভারতীয় শিল্পাঞ্চল। রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আসা-যাওয়া বেশ সুবিধাজনক হবে। ত্রিপুরার আগরতলা থেকে সাব্রুম পর্যন্ত এসে গেছে ট্রেন, যা চালু হয়েছে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। এছাড়া ভারতের জাতীয় মহাসড়ক-৮ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাব্রুম, যা চলে গেছে আগরতলা হয়ে অসমের করিমগঞ্জ পর্যন্ত। সবমিলে ভারতীয় প্রান্তে প্রস্তুতি প্রায় শতভাগ। এখন শুধু বাংলাদেশ প্রান্ত থেকে উন্মুক্ত হওয়ার অপেক্ষা।

উল্লেখ করা যেতে পারে, রামগড়ে স্থলবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে। প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা ওই বছর ভারত সফরে গেলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে সিদ্ধান্তের আলোকে রামগড়ে ফেনী নদীর ওপরে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০১৫ সালের ৬ জুন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে ফলক উন্মোচন করেন। ২০১৭ সালের নবেম্বর মাসে শুরু হয় নির্মাণ কাজ। ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুতে পিলার ১২টি, যা ৮টি বাংলাদেশ অংশে এবং ৪টি ভারতীয় অংশে। সেতুটি দুই লেনের হলেও বেশ মজবুত স্থাপনায় নির্মাণ করা হয়েছে, যার স্থায়ীত্বকাল ধরা হয়েছে প্রায় এক শ’ বছর।