পরিকল্পিত হামলায় তছনছ শহর, দৈনিক ভোরের কাগজের প্রতিবেদন

15

অভিজিৎ ভট্টাচার্য।। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউতলী মোড়ে সোহাগ পরিবহনের বাস থেকে নামলেই হাতের বাঁয়ে চোখে পড়ে পুড়ে যাওয়া জেলা পরিষদের রেস্ট হাউস। আগুনের কালো ধোঁয়ার দাগ নিয়ে ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা পাহারা দিচ্ছেন। একটু এগোলেই ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সেখানে জনা বিশেক তরুণ জটলা বেঁধে বসে আছে। সবারই এক কথা, শহরটার কি হয়ে গেল ? ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে জেলা প্রশাসকের অফিসসহ নানা সরকারি অফিস। বেশির ভাগ অফিসের মূল ফটক আক্রান্ত।

একদা শিল্পসংস্কৃতির পাদপীঠ ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সব জায়গায় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের তান্ডবের ক্ষত। এই প্রতিবেদক মঙ্গলবার (৩০ মার্চ) দিনভর শহর ঘুরে দেখেন সেই ক্ষতচিহ্ন। প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অনেকটা পরিকল্পিতভাবেই সেদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তান্ডব চালানো হয়েছে। আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রগতিশীল মহল, আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। তবে স্থানীয় জনমনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেটি হলো হামলার দিন (২৮ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন কোথায় ছিল ? শহরের কোথাও তাদের তৎপরতা ছিল না। এই সুযোগে বিনা বাধায় তান্ডব চলেছে শহরজুড়ে।

স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মঙ্গলবার দুপুরে বিক্ষোভ করেন সাংবাদিকরা। পাশেই মোতায়েন বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব। ওই বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তৃতাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রহিম বিজন বলেন, সেদিন শহরের যে স্থাপনাগুলো আক্রান্ত হয়েছিল তার সবকটির সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নিয়ে গেছে। হামলার আগে শহরের কাজীপাড়া, বিশ্বরোড অবরোধ করে রাখা হয়েছিল। যেভাবে হামলা হয়েছে তাতে প্রশ্ন ওঠে এই অবস্থা কারা করল ? ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসে এমনটি আর কখনো ঘটেনি। হেফাজত ইসলামের হরতালের দিনে এমন ন্যক্কারজনক তান্ডব চলেছে। কাজেই হেফাজতকে এই ঘটনার দায় নিতে হবে। আমরা এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। একই সঙ্গে সেদিন হামলার সময় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা আছে কিনা তা তারা নিজেরাই খতিয়ে দেখবেন। এছাড়া এই ঘটনার দোষীদের খুঁজে বের না করা পর্যন্ত হেফাজতে ইসলামের সব খবর বয়কটের ঘোষণা দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিকরা।

শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামের ডাকা কর্মসূচিতে ঢাকায় বায়তুল মোকাররমে পুলিশের হামলা এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে পুলিশের গুলিতে ৪ জন মাদ্রাসা ছাত্র নিহতের খবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছলে হেফাজতে ইসলাম শহরের একাধিক স্থান থেকে ২৬ মার্চ বিকেলে লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল বের করে। ওই মিছিল থেকেই মূলত শুরু হয় তান্ডবলীলা। ওই দিনই শহরের ২ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ি, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন, গণপূর্ত ভবন, সড়ক ভবন, মৎস্য ভবন, সিভিল সার্জনের কার্যালয়, সার্কিট হাউস আক্রান্ত হয়। সার্কিট হাউসে জেলা পরিবহন পুলের ১০টি গাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে দুই নম্বর পুলিশ ফাঁড়িতে ১০টি মোটরসাইকেল এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ৪টি গাড়ি এবং ১০টি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একটি এবং মৎস্য ভবনের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। একই সঙ্গে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মূল্যবান কিছু নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ও আক্রান্ত হয়।

পরের দিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ আগে থেকে চলতে থাকা জেলা উন্নয়ন মেলায় হেফাজতকে উদ্দেশ্য করে এবং ঘটনার জন্য তাদের দায়ী করে বক্তৃতা দেন স্থানীয় সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী। তিনি বলেন, যারা আগের দিন (২৬ মার্চ) সরকারি অফিসে গিয়ে কম্পিউটার পুড়িয়েছে, গাড়ি পুড়িয়েছে তারা বর্বর, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। তাদের সঙ্গে বিজ্ঞান ও ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান তিনি। পরে ওইদিনই দুপুরে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে দলীয় নেতাকর্র্মীদের নিয়ে পৌরভবনে বৈঠকে বসেন সাংসদ। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওইদিন বিকেলে পৌর মিলনায়তনে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ সভা হয় এবং সভাশেষে শহরে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের ঘোড়াপট্টি ব্রিজ অতিক্রম করার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শহরের জামেয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। একই সময়ে সদর উপজেলার নন্দনপুরে হেফাজতের কর্মী সমর্থক, গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। টানা দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে ৬ জন নিহত হয়। পরে আরো ৭ জন মারা যান। মারা যাওয়াদের প্রায় সবাই মাদ্রাসা ছাত্র। এরপর শহরে বিজিবি সদস্যরা অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু নন্দনপুরের ঘটনা ও মৃত্যুর খবর পেয়ে জামেয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসাসহ জেলার সব মাদ্রাসায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

পরদিন ২৮ মার্চ পূর্ব নির্ধারিত হরতালে সকাল ৭টা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সকাল ৯টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল দেয় তারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ থেকে হেফাজত কর্মীরা মিছিলসহ শহরে প্রবেশ করতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শহর থেকে সটকে পড়ে। এ সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা থেকে মাইকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলা হয়, আপনারা আপনাদের আন্দোলন চালিয়ে যান, সদর থানায় কেউ আক্রমণ করবেন না, পুলিশ আপনাদের বাধা দেবে না।

এমন ঘোষণা পাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা আস্কারা পায়। এই সুযোগে উগ্রবাদীরা হাতে লোহার রড, পাইপ, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরজুড়ে খন্ড খন্ড জঙ্গি মিছিল বের করে। এরপর রীতিমতো পরিকল্পনা করে বেছে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, মুক্তিযোদ্ধা ভবন এবং মুক্তচিন্তা ও শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চাকেন্দ্র ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানঁ সঙ্গীতাঙ্গন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি গণগ্রন্থাগার, শহরের প্রধান মন্দির আনন্দময়ী কালীবাড়ি ও সদর উপজেলা ভূমি অফিস, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষাচত্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরভবন এবং পৌর মিলনায়তন, জেলা পরিষদ ভবন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের কার্যালয় ও বাসভবন, আবদুল কুদ্দুছ মাখন মুক্তমঞ্চ, প্রেস ক্লাব ভবন, জেলা পুলিশ লাইন্স, ফায়ার সার্ভিসের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, পুলিশ সুপারের বাসভবন, সরাইল হাইওয়ে থানা, ঢাকা-চট্টগ্রামে চলাচলকারী ট্রেন সোনার বাংলা এক্সেপ্রেস, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাসভবন পুড়িয়ে দেয়া হয়। বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিাংল ইসলাম ভূঁইয়ার অফিস ভাঙচুর করা হয়। বিজয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নাছিমা মুকাই আলীর হালদারপাড়াস্থ বাসভবন ভাঙচুর করা হয়। হরতাল চলাকালে শহরের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা মধ্যপাড়া, পূর্ব পাইকপাড়া, কালাইশ্রীপাড়াসহ বেশ কয়েকটি পাড়া মহল্লায় দোকানপাট লুট করা হয়। এই সময়ে কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের চেষ্টা করা হয়। অনেকেই বলেছেন, এসব হামলায় কিছু লোককে দেখা গেছে, প্যান্টশার্ট পরিহিত অবস্থায়। তাদের হাতে কৌটাভর্তি সাদা পাউডার ছিল বলে দেখেছেন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন । সব মিলিয়ে ২৮ মার্চ শহরজুড়ে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তান্ডব চলছে। ওই সময়টুকু শহরের কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসনের কেউ ছিলেন না। এর ফলে আন্দোলনকারীরা শহরজুড়ে অনেকটা ফ্রিস্টাইলে তান্ডব চালিয়েছে। বিকাল ৪টায় হেফাজতের পক্ষ থেকে শহরের জামেয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণার পরপরই তান্ডবকারীরা গা ঢাকা দেয়। এরপর সাধারণ মানুষ শহরে ধ্বংসযজ্ঞ দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ে এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে শহর ফাঁকা হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দিনভর তান্ডবের পর রাতে শহরজুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। রাত ৮টার পর শহরের ফের বিজিবির টহল শুরু হয়। তখন বিজিবির পক্ষ থেকে মাইকিং করে জানানো হয়, শহর ফাঁকা করার জন্য। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইরেনের শব্দে পুরো শহরে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি শহরজুড়ে অবস্থান নেয়। দিনের ঘটনার সময়ে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। যথারীতি ২৯ মার্চ থেকে শুরু হয় সরকারি বড় বড় কর্মকর্তাদের শহর পরিদর্শন।

জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, ওই দিনের ঘটনায় পুলিশের অনেক লোক আহত হয়েছিল। তবুও জানমাল রক্ষায় পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে আরো বেশি ক্ষতি হতো বলে তিনি জানান। হামলায় কারা অংশ নিয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরো বিষয়টির এখন তদন্ত চলছে এবং তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, হামলার দিনে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে কর্মরতরা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিজের বাড়িতে রাখেননি। ভয়ে তাদের অন্যত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কর্মকর্তাদের স্ত্রী, সন্তানরা ঘরে ফিরতে শুরু করে। তবে এ বিষয়টি স্বীকার করলেও জেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি আব্দুর রহিম জানিয়েছেন, হামলার দিনে পুলিশের তরফ থেকে মাইকিং করে হেফাজতের আন্দোলনে সমর্থনের যে কথা বলা হয়েছিল তা সঠিক নয়। গতকাল তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ওইদিনের ঘটনায় পুলিশ আক্রান্ত। পুলিশ এমন কথা বলেনি। হামলার পর তার থানায় দুই দফায় এ পর্যন্ত  ৫টি মামলা হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে চারটি মামলায় অজ্ঞাত ৫ হাজার আসামি। একটি মামলায় ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। তবে এই ১৪ জন কারা, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তিনি দিতে চাননি। এদিকে মঙ্গলবার আশুগঞ্জে আরো দুটি মামলা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই দিনের হামলায় জেলার আশপাশের রাজঘর, ভাটপাড়া, নাটাই, বিরাসার, বিহাইর, নরসিংহসার, পয়াগ ও কালিসীমার গ্রামের লোকজন হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে হামলায় যোগ দেয়। এসব গ্রামের মানুষজন প্রথমে পুলিশ লাইন্সে হামলায় অংশ নেয়। তারপর পর্যায়ক্রমে শহরের অন্যান্য স্থাপনায় হামলায় অংশ নেয়। একই সঙ্গে কান্দিপাড়া, মাইমলহাটি এবং কাজীপাড়া, ফকিরহাটি এলাকার কিছু লোকসহ জামায়াত-শিবিরের উগ্রবাদীরা জঙ্গি স্টাইলে হামলায় অংশ নেয়। তারাই মূলত হেফাজত নেতাদের নির্দেশে শহরে বেছে বেছে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালসহ মুক্তিযুদ্ধ অফিস, সরকারি অফিস, আওয়ামী নেতাকর্মীদের বাড়িসহ নানা স্থাপনায় তান্ডবলীলা চালায়। একই সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ মোক্তাদির চৌধুরীর বিরোধী একটি পক্ষ, ছাত্রদল, যুবদলেরও একটি পক্ষ হামলায় অংশ নেয় বলে স্থানীয়রা বলেছেন।

জানতে চাইলে আবু হোরায়রাহ ভোরের কাগজকে বলেন, আমার ৬৮ বছর বয়সের জীবনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে এমন তান্ডব দেখিনি। দেশের সম্পদ নষ্ট করে এমন তান্ডব পরিকল্পনা ছাড়া করা সম্ভব নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বলেন, বস্তির ছেলেরা এসে দলবেঁধে শহরজুড়ে হামলা চালিয়েছে। বেছে বেছে তারা মুক্তবুদ্ধির চিন্তা-চেতনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছে। ধ্বংস করে দিয়েছে অধিকাংশ অবকাঠামো। এরকম পৈশাচিক ঘটনা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বররাও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করেনি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যে শহরের থানার পুলিশ মাইকিং করে বলে আপনারা আপনাদের কর্মসূচি পালন করুন, থানায় হামলা করবেন না; সেই শহরে আপনি কি নিরাপত্তা পাবেন ? সঙ্গতকারণেই নানা প্রশ্ন উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার প্রশ্ন, আমরা কি তালিবানি রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছি?

শহর ঘুরে দেখা গেছে, তান্ডবলীলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন। প্রতিষ্ঠানে ঢুকে দেখা গেছে, পুরো ভবনের মেঝেতে ছাই পড়ে আছে। আগুনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সরোদ, সঙ্গীতের বই, পান্ডুলিপি, আড়াই হাজার ছবি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানেই ২৬ মার্চ জেলা প্রশাসনের কর্মসূচি ছিল। প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম ভোরের কাগজকে বলেছেন, ৭১ এর চেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে ২১ সালের ২৮ মার্চ। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে প্রতিটি সরকারই ছিল ইসলামি মনোভাবাপন্ন। তবুও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর এই প্রতিষ্ঠান পুড়েনি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এই সঙ্গীতাঙ্গন এরকম একটি মধ্যযুগীয় হামলার শিকার হলো। তিনি বলেন, ওই দিনের হামলায় শতশত উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গানপাউডার দিয়ে এই সঙ্গীতাঙ্গনকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা তারা ঘটিয়েছিল ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি। পাঁচ বছর আগে হামলার পর স্থানীয় সাংসদের আনুকূল্যে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু এবার সব শেষ হয়ে গেছে। সেদিনের হামলার বিচারও আজ পর্যন্ত হয়নি।

পাশেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা এসিল্যান্ড অফিসে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটক তালা দেয়া। ফটক খুলিয়ে এই প্রতিবেদক ভেতরে যেতেই চোখে পড়ে মানুষের জমিসংক্রান্ত সব দলিল পুড়ে ছাই হয়ে পড়ে আছে। এমনকী এসিল্যান্ডের বসারও জায়গা নেই, সেটিও পুড়ে গেছে। হামলার আগে অফিসের পানির পাইপ ভাঙা হয়েছে। তারপর সিসিটিভি ক্যামেরা খোলা হয়েছে এবং সবশেষে আগুন দিয়ে পুরো অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। হামলার দুদিন পর মঙ্গলবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পোড়া অফিস পরিদর্শন করেন। সব দেখে মাথা নিচু করে চলে যান তিনি। পরে এসিল্যান্ড মশিউজ্জামান বলেন, কী কী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার তালিকা করছি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরভবনে দেখা যায়, ফটক লাগানো। অফিসের নিচতলায় অনেক পুড়িয়ে দেয়া গাড়ি পড়ে রয়েছে। ভবনজুড়ে আগুনোর কালো ধোঁয়ার দাগ। প্রায় ১২/১৩টি পুড়ে যাওয়া আলমিরা ফেলে রাখা হয়েছে। পৌরসভার মিলনায়তন যেটি টাউন হল নামে পরিচিতি সেখানে সারি সারি চেয়ার পুড়ে রয়েছে। পুরো মিলনায়তন পুড়ে ছাই। অনেকেই বলেছেন, কিছুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ভোট হয়ে গেছে। ওই ভোটে অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। যারা ভোট দিতে পারেননি তাদের মধ্যে অনেকেই হেফাজতের সঙ্গে যোগ দিয়ে তান্ডবলীলায় অংশ নিয়েছেন এবং তারাই পৌরভবন জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

পৌরভবনে পেছনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বর। সেখানে প্যান্ডেল সাজিয়ে চলছিল উন্নয়ন মেলা। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, প্যান্ডেল আগুনে পোড়ানো। পোড়া কাপড় বাঁশের মাথায় ঝুলছে। মাঠজুড়ে ভাঙা চেয়ার পড়ে আছে। পাশেই জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের কার্যালয়। পুরো ভবনটি এমনভাবে পুড়েছে, ভবনটি না ভেঙে ঠিক করার উপায় নেই।

শহরের মেড্ডা এলাকা থেকে পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে আসা ষাটোর্ধ্ব রেহানা বেগম পুড়ে যাওয়া ভবনগুলো ঘুরে দেখেন। এ সময় ছবি তোলেন তার পূত্রবধূ। পুড়ে যাওয়া ভবনের ছবি কেন তুলছেন জানতে চাইলে চোখ থেকে জল মুছে রেহানা বেগম বলেন, আমার জীবনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন হামলা হয়েছে বলে শুনিনি। তাই হামলার দৃশ্যগুলো মোবাইলে ধরে রাখছি। কেঁদে কেঁদে তিনি বলেন, গতকাল আমার ছেলেকে নিয়ে এসেছিলাম দেখতে আজ এসছি ছেলের বউকে নিয়ে।

পাশে দাঁড়ানো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রৌঢ় নিজেকে পৌরভবনের পাশের বাড়ির বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে বলেন, পুলিশ পাহারা থাকলে কিছুই হতো না। ফায়ার সার্ভিসও ছিল না। আমরা গিয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দিয়েছি। তারা প্রথমে আগুন নেভানোর জন্য আসতে চায়নি। আমরা অনুরোধ করার পরে এসেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বড় মন্দির আনন্দময়ী কালীবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কালি প্রতিমার হাত ভাঙা। পূজার সামগ্রী এবরো থেবড়োভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে। মন্দিরের পুরোহিত জীবন চক্রবর্তী বলেন, ২৮ মার্চ দুপরে ওরা এসেছিল। ‘আল্লাহ আকবর’ ধ্বনি দিয়ে মূর্তি ভাঙা শুরু করে। তাদের হাতে ছিল শাবল, রড, বাঁশ, সাদা পাউডার। ভাঙচুরের পর হামলাকারীরা মন্দিরে রক্ষিত ৩৪ ভরি স্বর্ণ এবং ৬৯ ভরি রৌপ্যের অলঙ্কার ও দানবাক্সে থাকা প্রায় ৫০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে একবার চলে যায়। ওই সময় দোলপূর্ণিমার আয়োজন চলছিল। হামলাকারীরা সেটিও তছনছ করে। পরে তারা আবার আসে। তখন প্রবীণ শিক্ষক গোপাল সূত্রধর তাদের আটকান। পুরোহিতের কথায় প্রথমবার যারা হামলা করেছিল তাদের মধ্যে ২০/২৫ জন মন্দিরে ঢুকেছে। বাকিরা বাইরে দাঁড়িয়েছিল। পরে যারা আসছিল তাদের মধ্যে অধিকাংশ বিকেলে মন্দিরে এসে বিড়ি টানত। একইসঙ্গে শহরের দক্ষিণ কালীবাড়ি মন্দির, মহাদেব পট্টির শিবমন্দির এবং মেড্ডায় তিনশ বছরের প্রাচীন শ্রীশ্রী কালভৈরব মন্দিরে হামলার চেষ্টা করে। রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, যেন এক ভুতুড়ে বাড়ি। চারদিকে ভাঙা, আগুনে পোড়ানো।

জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, সেদিনের হামলার দায়দায়িত্ব হেফাজতে ইসলামকেই নিতে হবে। কারণ তারা কর্মসূচি দেয়ার কারণেই শহরজুড়ে তান্ডব চলেছিল। হামলায় কি শুধু হেফাজতে ইসলামই অংশ নিয়েছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু যে হেফাজত তা নয়, ছাত্রদল ছিল, যুবদল ছিল এমনকী একসময় যারা আমার দল করত এখন করে না তারাও থাকতে পারে। তবে সবমিলিয়ে দায় হেফাজতকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা কি ছিল তা নিয়েও বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। অনেকেই বলেছেন, হামলার দিনে পুলিশ ও প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা সক্রিয় না নিষ্ক্রিয় ছিল তা আমি বলছি না। মূলকথা হচ্ছে, হামলার দিন তাদের আমি মাঠে দেখিনি। নিজের বিষয়ে তিনি বলেন, সেদিন আমি মাঠে নামতে পারতাম, কিন্তু নামিনি। নামলে হয়তো ক্ষতি আরো বেশি হতো। পৌরসভা ভোটেরও একটি ইস্যু ছিল আন্দোলনে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এজন্যই তো বলছি পুরো ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক।