বাংলাদেশে নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও ধর্ষণ নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ

7

।। বিশেষ প্রতিনিধি।। সম্প্রতি বাংলাদেশে একের পর এক ধর্ষণ ও নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। ঢাকার জাতিসংঘ মিশন থেকে গতকাল বুধবার পাঠানো এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে সম্প্রতি ধর্ষণ ও নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিসংতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে জাতিসংঘ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীর প্রতি চরম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনা গুরুতর অপরাধ এবং মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। নোয়াখালীতে ঘটে যাওয়া নারী-সহিংসতার ঘটনাটি, যা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তা সামাজিক, আচরণগত এবং কাঠামোগতভাবে বিদ্যমান নারী-বিদ্বেষকে ফুটিয়ে তুলেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ ন্যায়বিচারের দাবিতে সাধারণ জনগণ এবং সুশীল সমাজের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তবে আমরা মনে করি, নোয়াখালীর ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, এটি কোন নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত সংস্কারের সুনির্দিষ্ট আহ্বান। নারী অধিকার সুরক্ষা ও শক্তিশালীকরণে, পদ্ধতিগত সংস্কারের পক্ষে আমরা আমাদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরছি। জেন্ডার সংবেদনশীল বিচার ব্যবস্থার প্রণয়ন ও উন্নয়ন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা পরিচালনার পদ্ধতিতে, ব্যাপক পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা করার জন্য জাতিসংঘ সর্বদা প্রস্তুত।

জাতিসংঘ ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সমর্থন ও সুরক্ষা প্রদান এবং বিচারের ক্ষেত্রে দ্রুততা আনয়নে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জরুরি সংস্কারের পক্ষে। এছাড়া, নারী ও মেয়েদের সুরক্ষার জন্য অসংখ্য আইন ও কর্ম পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সে সম্পর্কে জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই।

জাতিসংঘ তাদের সকল অংশীদারদের সাথে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জেন্ডার বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক নীতিগুলোকে চিহ্নিত করে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে কাজ করছে। আমরা এমন একটি সমাজ গঠনে কাজ করছি যেখানে নারী ও মেয়েরা নিরাপদ বোধ করবে এবং তারা ক্রমে উন্নয়নের দিকে যাবে। এ ব্যাপারে, বৈশ্বিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। কারণ আমরা দেখতে পাই যে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সব অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত, কিন্তু সবচেয়ে কম সাজাপ্রাপ্ত। এর বিরুদ্ধে অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে বলে জানানো হয়েছে জাতিসংঘের বুধবারের বিবৃতিতে।

গত ৪ অক্টোবর প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারীর পোশাক ছিনিয়ে নেয় এক দল লোক। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে তার উপর নির্যাতন চলে। তাকে চড়, লাথি, ঘুষি মারে। মারধরের এই দৃশ্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়। আর এই ঘটনা হলো বাংলাদেশে নারীদের প্রতি সহিংসতার ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ঘটনা।

নোয়াখালীতে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় ন্যায়বিচার দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। মঙ্গলবার অ্যামনেস্টি জানায়, একদল পুরুষ একজন নারীকে বিবস্ত্র করে মারধর করেছে। নির্যাতনের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে এর ন্যায়বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান মনে করেন, যদি আইনের শাসন বড্ড দুর্বল হয়ে যায় তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। দেশে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে গেছে। দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণ হলো প্রভাবের একটি বলয় তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার আইনের শাসনকে কোনঠাসা করে ফেলেছে।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই নয় মাসে প্রতিদিন গড়ে তিনটির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। নয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি।

আসক বলেছে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে ছাত্রাবাস দখল করে থাকা আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিতি ছয়জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। এ পর্যন্ত অভিযুক্তদের সকলেই ধরা পড়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া এই তরুণীর ধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার পরপরই নোয়াখালীর এক গৃহবধুকে বিবস্ত্র করে তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটল। ওই নারী নয়জনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেছেন।

আসকের হিসাবে চলতি বছর গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন নারী। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন নারী। আর আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। গত নয় মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৬১ নারী। এর মধ্যে যৌন হয়রাণির কারণে ১২ নারী আত্মহত্যা করেছেন। আর যৌন হয়রাণির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিন নারী এবং ছয় পুরুষ নিহত হয়েছেন।

গত নয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে জুন মাসে। এ মাসে ১৭৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই মাসে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৩৯টি। নয় মাসের এ সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র আরও জানায়, এ সময়কালে দেশে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপসহ নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটেছে।