বছরজুড়ে ধর্ষণ, নির্যাতনের ভয়াবহতা

13

করোনা অতিমারির বছরেও দেশে নারী ও শিশু সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি। আগের বছরের মতো অব্যাহত ছিল সহিংসতা। সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতা। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬ হাজার ৯০০ জন নারী। গত বছরের তুলনায় যা বেশি। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১২ মাসে ধর্ষণের শিকার হন ৬ হাজার ৭০০ জন। গত বছর নির্যাতনের শিকার হয় ২১ হাজার ৭৬৯ জন নারী ও শিশু।

প্রথম আলো জানায়, বছরের শুরুতে ৫ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। বছরের শেষ ভাগে সিলেটে ২৫ সেপ্টেম্বর স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে বের হয়ে নববিবাহিত এক তরুণী ছাত্রলীগের কর্মীদের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় সারা দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। অল্প দিনের ব্যবধানে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই দুই ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপকভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভের দুই সপ্তাহের মধ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে ১৩ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনে সরকার।

বছরজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ঘটনায় ভয়াবহতার মাত্রা ছিল উল্লেখ করার মতো। ১২ জুন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়। মেয়েটির ক্যানসারে আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে মা ঢাকায় হাসপাতালে ছিলেন। ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সে নানাবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে আসে। বাড়িতে একা পেয়ে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

মেয়েটির কাপড়চোপড় গোছানো ব্যাগটি পাশেই পড়ে ছিল। ১৬ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় ঘরের সিঁধ কেটে ৬ বছরের ঘুমন্ত শিশুকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ধর্ষণের পর নদীর পাড়ে ফেলে যায়। ৭ নভেম্বর রাতে গাজীপুরে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার কিশোরী বাসে বাসে চকলেট ফেরি করত।

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় অটোরিকশায় থাকা তরুণীকে (১৯) বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে পাশের বাগানে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে তিন তরুণ।

শিশু নির্যাতন

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি কি বিচার পাব না ?’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে করোনাকালে ২৪ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সমকালের প্রতিবেদক সাজিদা ইসলাম পারুলের ছবিটি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিয়ের এক মাসের মধ্যে বিচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া স্বামী দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদক রেজাউল করিম ওরফে প্লাবনের বিরুদ্ধে যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ জানিয়ে মামলা করেন তিনি। ওই মামলায় এখনো গ্রেপ্তার হননি রেজাউল করিম।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) জানিয়েছে, অঘোষিত লকডাউনের সময় গত মে মাসে ৩১ দিনে দেশের ৫৩টি জেলায় ১৩ হাজার ৪৯৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। ১১ হাজার ২৫ জন, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ঘটেছে স্বামীর হাতে। ৫৩ হাজার ৩৪০ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে ফোনে কথা বলে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

ঘটনা খতিয়ে না দেখে নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে বলতে রাজি নন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এ বছর ধর্ষণ, নির্যাতন বেশি বলছেন। নির্যাতনের ঘটনা বেশি কি না, সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। প্রতিটা ঘটনা তদন্ত করে খতিয়ে দেখা উচিত, কারণগুলো কী কী।’

শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২৭টি। আগের বছরের তুলনায় নির্যাতনের সংখ্যায় তেমন কোনো হেরফের হয়নি। ওই বছর ১১ মাসে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল ২ হাজার ৪৯টি।

নারী নির্যাতন

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক (কর্মসূচি) নিনা গোস্বামী বলেন, এ বছর পারিবারিক সহিংসতা ও ধর্ষণ-এ দুটি নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটেছে।

পারিবারিক সহিংসতা বেশি ঘটার কারণ ছিল করোনাকালে অঘোষিত লকডাউনের সময় ঘরের কাজ, মুঠোফোনে কথা বলা, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ ইত্যাদি নানা ছোটখাটো ইস্যুতে অসহিষ্ণুতা, খিটিমিটি, ঝগড়া থেকে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আর ধর্ষণের বিষয়টি দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করার পরিণতি। ধর্ষণের মামলার মাত্র ৩ শতাংশের বিচার হয়। ফলে সমাজে এ বার্তা নিশ্চিত করা যায়নি যে ধর্ষণ করলে কঠোর সাজা হতে পারে। বিচার নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যুদন্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজার বিধান রেখে কোনো লাভ নেই বলে মনে করেন তিনি।

নির্যাতনের যত ঘটনা, সে তুলনায় গণমাধ্যমে খবর কম এসেছে। বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নয়টি জাতীয় পত্রিকা, কয়েকটি পোর্টাল ও নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তথ্য সংগ্রহ করে। সংগঠনটি জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের খবর প্রকাশ পেয়েছে ২ হাজার ৫২৫টি। হত্যার খবর প্রকাশ পেয়েছে ৪৯২টির। এর মধ্যে শুধু পারিবারিক সহিংসতায় হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪৪ জন।

ধর্ষণ

নারী ও শিশুর প্রতি পুরুষের অপরাধ প্রবণতা ও করোনার সময়েও এ ধারা অব্যাহত থাকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান  বলেন, করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকট থেকে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি বেড়ে যেতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, নারীর জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিতে, বিশেষ করে সম্পদের ওপর অধিকারের ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নেই। কোনো শিশু যখন আশপাশে এমন অবস্থা দেখে বড় হয়, তখন সে নিজেকে ক্ষমতায়িত মনে করে। পরিবারে মা ও মেয়েদের প্রতি বাবার সহিংস আচরণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়ায়। অধ্যাপক  ফারজানা আরও বলেন, এ দেশে সামাজিক কাঠামোও ধর্ষণের জন্য ‘উর্বর’ জায়গা।

স্কুলপর্যায়ে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের মধ্যে যৌনতা বিষয়ে নানা ধরনের ভাবনা কাজ করে। এ থেকে কিশোরদেরও ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।