প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দির নিয়ে প্রবর্তক সংঘ ও ইসকনের বিরোধ প্রসঙ্গে ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের বিবৃতি

32

চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকায় গত ৬ ও ৭ এপ্রিল, ২০২১ এ প্রকাশিত প্রবর্তক সংঘ ও ইসকনের বিজ্ঞাপনের বক্তব্য দৃষ্টে সংশ্লিষ্ট জনমনে বিভ্রান্তির আশংকায় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত নি¤েœাক্ত বিবৃতি প্রদান করেছেন –

প্রবর্তক  শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দির সংক্রান্তে প্রবর্তক ও ইসকনের মধ্যেকার অনভিপ্রেত ঘটনা চলাকালে আমি বিদেশে ছিলাম। তাই এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না। বিদেশ থেকে গত ২১ মার্চ,২০২১ দেশে ফেরার পরদিন সন্ধ্যায় ২২ মার্চ চট্টগ্রাম ইসকনের সম্পাদক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীজীর নেতৃত্বে ৭/৮ জন প্রভু আমার বাসভবনে এসে দেখা করেন এবং কতক ছবি ও কাগজপত্র দেখিয়ে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন ও উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেকার বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিস্পত্তির নিমিত্তে মধ্যস্থতা করার আবেদন জানান। আমি তাঁদেরকে সামনে রেখে প্রবর্তক সংঘের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের তা অবহিত করলে তাঁরাও একই প্রস্তাব সমর্থন করেন। প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দিরের প্রভু লীলারাজ ব্রহ্মচারী মে মাসের দিকে নবনির্মিত মন্দিরের উদ্বোধনের বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন জানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বৈঠক আয়োজনের অনুরোধ জানালে আমি ২ থেকে ৪ এপ্রিল, ২০২১ ঢাকায় ঐক্য পরিষদের পল্টন টাওয়ারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠকের কথা জানালে সবাই তাতে সম্মত হন। এ সময়ে স্থানীয় ইসকনের ব্রহ্মচারীবৃন্ধ ইসকনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারীও বৈঠকে আবশ্যিক উপস্থিতির দায়িত্ব নিজেরা  গ্রহণের কথা বলেন। আমি তাঁদেরকে সামনে রেখে প্রবর্তকের সাধারণ সম্পাদক শ্রী তিনকড়ি চক্রবর্তীকে এ ব্যাপারে অবহিত করলে তিনি তাঁদের পক্ষ থেকেও সম্মতি জানান।

উল্লেখিত মতে বৈঠকের তারিখ ও স্থান নির্ধারিত হবার পর আমি তাঁদেরকে জানাই যে, যেহেতু আমি চট্টগ্রামের সন্তান সেহেতু নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যাতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে তজ্জন্যে ঢাকায় অবস্থানরত কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা সর্বশ্রী এ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কাজল দেবনাথ, সাংবাদিক বাসুদেব ধর ও মিলন কান্তি দত্ত ছাড়াও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকে এতে পর্যবেক্ষণকারী আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদানের অনুরোধ করার কথা জানালে উভয় পক্ষ তাতে সম্মত হন। ২৫ মার্চ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীজী ঢাকায় ফোনে এ মর্মে আমাকে অনুরোধ করেন যে, চট্টগ্রামের প্রভুরা চান চট্টগ্রামে বৈঠকটি হোক। কারণ, অনেকের পক্ষে ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হবে না। আমি প্রভুকে উত্তরে বিনীতভাবে জানাই যে, ২১ এপ্রিলের আগে চট্টগ্রামে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া ইতিমধ্যে যেসব ব্যক্তিকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তাঁরাও শুধুমাত্র এই বৈঠকের জন্যে চট্টগ্রামে যাবেন না। তাছাড়া এও বলেছি, অধিক সংখ্যক লোক রেখে সমাবেশ করা যায়, বক্তব্য দেয়া যায়  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এ কথা বলে তাঁকে প্রয়োজনে ৫/৬ জন প্রভু নিয়ে ঢাকায় এসে নির্ধারিত বৈঠকে যোগ দেয়ার অনুরোধ জানাই। তিনি এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন নি। তাছাড়া আমন্ত্রিতদের অন্যতম শ্রী কাজল দেবনাথ গত ২৬ মার্চ এক নির্ধারিত অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসার পর আমাকে জানান যে, ইসকনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারীজীর সাথে তাঁর একান্ত আলাপে তিনিও ২ এপ্রিল নির্ধারিত বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন। আমি এতে অধিকতর আশ^স্ত হই।

বৈঠকের নির্ধারিত দিন সকাল ১০ টার মধ্যে আমন্ত্রিত অতিথিরা সবাই উপস্থিত হন। সাংবাদিক শ্যামল দত্ত বিদেশে থাকায় উপস্থিত হতে পারেন নি। প্রবর্তক সংঘের পক্ষে অধ্যাপক রণজিৎ কুমার দে ও শ্রীতিনকড়ি চক্রবর্তী মহোদয় উপস্থিত হন। তাদের উপস্থিতির দীর্ঘক্ষণ পরেও ইসকন  হাজির না হওয়ায় আমন্ত্রিতরা এতে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রবর্তক সংঘের কর্মকর্তারা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আমি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কোন প্রেক্ষিতে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নিতে বাধ্য হই তা তুলে ধরার পাশাপাশি ইসকন এর সম্পাদক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীজীসহ আমার বাস ভবনে যে সব ছবি ও কাগজপত্রাদি দেখিয়েছেন তা সবিস্তারে তুলে ধরি।

অত:পর বৈঠকে উপস্থিত আমন্ত্রিতদের নিয়ে আমি প্রবর্তক সংঘ ও  ইসকনের মধ্যে প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দির সংক্রান্তে বিরোধ মীমাংসায় ৫টি সমাধানসূত্রে সর্বসম্মতিক্রমে একমত হই। এ সমাধান সূত্রাবলী হলো-

(১) ২০০৪ সালে প্রবর্তক  সংঘ কর্তৃপক্ষ ও ইসকনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারীজীর মধ্যেকার সম্পাদিত চুক্তি মান্যে উভয় পক্ষ বাধ্য থাকবে;

(২) চুক্তিতে উল্লেখিত স্থানে প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দিরের পেছনে থাকা পুরনো প্রবর্তক মন্দিরের পুর্বতন সাধু নিবাসের স্থানে প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দিরের বহুতল ভবন প্রবর্তক সংঘ কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে  নির্মাণক্রমে ব্রহ্মচারীজীদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে;

(৩) প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দিরের সাথে লাগোয়া প্রবর্তক পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত ৩-তলা ভবনের নির্মাণব্যয় উভয় পক্ষের প্রকৌশলীদের সম্মতিতে নির্ধারণক্রমে তা ইসকনকে প্রদানে প্রবর্তক সংঘ বাধ্য থাকবে। উক্তরূপে  নির্মাণব্যয়ে  সমুদয় অর্থ গ্রহণান্তে ইসকন তা প্রবর্তক সংঘের বরাবরে অর্পণ করবে এবং প্রবর্তক সংঘ তার দখল  গ্রহণে প্রতিষ্ঠানের সমাজহিতৈষী নানাবিধ কর্মকান্ড পরিচালনায় ব্যবহার করবে;

(৪) প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দির নির্মাণকাজ চলাকালীন অনুমতিক্রমে অস্থায়ী ভিত্তিতে ব্যবহার করা প্রবর্তক সংঘের স্থাপনাসমূহ উক্ত প্রতিষ্ঠানের বরাবরে অনতিবিলম্বে  ইসকনকে  খালি করতে হবে;

(৫) প্রবর্তক শ্রীশ্রী কৃষ্ণ মন্দিরে ইসকন পূজা-অর্চনায় নিয়োজিত  প্রতিষ্ঠান বিধায়  প্রবর্তক সংঘ  ও ইসকন উভয়ে শান্তিপুর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে এবং যেকোন ধরণের হিংসা ও বিদ্বেষমূলক কর্মকান্ড পরিহারে বাধ্য থাকবে।

এ সমাধানসূত্র পরবর্তীতে প্রবর্তক সংঘ কর্তৃপক্ষ ও গত ৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইসকন এর সম্পাদক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীজীকে ফোনে অবহিত করা হয়েছে।