পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশ

23

রাণা দাশগুপ্ত, কলকাতা থেকে ফিরে

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন আর মাত্র ছয়দিন পর ২৭ মার্চ থেকে। চলবে ৮ দফায়। ভোট গণনা হবে  ২ মে।

মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের এলাকাভিত্তিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। কলকাতার অলিগলিতে প্রার্থীদের নামে প্রতীকসহ দেয়াল লিখন দেখা গেছে। এর পরে রয়েছে বাম-কংগ্রেস মোর্চা। দিলীপ ঘোষের বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতাদের দিল্লী থেকে নিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গের নানান জায়গায় নির্বাচনী সমাবেশ করলেও এলাকাভিত্তিক প্রচারণায় আজও পিছিয়ে বলে মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী মাঠে এপার বাংলার হাওয়া লেগেছে। সেখানকার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এর সুপ্রিমো মমতা বন্দোপাধ্যায় তার নির্বাচনী এলাকা নন্দীগ্রামে গিয়ে স্থানীয় এক মন্দিরে পুজো দেন এবং হরিনাম সংকীর্তনে অংশ নিয়ে নিজের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তার প্রতিদ্বন্দ্বীও কয়েক মাস আগেরও ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারী তাকে ‘ভেজাল হিন্দু’ বলে আখ্যায়িত করেন। আর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান ও প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির কেন্দ্র থেকে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা গায়ে গেরুয়া কাপড় জড়িয়ে প্রতিনিয়ত কোন না কোন মন্দিরে ধর্ণা দিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিগত নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রায় সব প্রধান দলের রাজনৈতিক নেতারা, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ধর্মের কাছে এমনতরোভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন তা তেমন কারোর জানা নেই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ ধারাটি প্রথম দেখা দেয় ১৯৯১ সালে। বিএনপি’র নেতারা মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন আর শ্লোগান তুলেন ‘শেখ হাসিনার অপর নাম হরে কৃষ্ণ হরে রাম।’ এ জাতীয় প্রচারণার টেক্কা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগও আরেক ধাপ জোর কদমে এগিয়ে আসে। নামের আদ্যাক্ষরে ‘আলহাজ¦’ লিখে মাথায় টুপি চাপিয়ে লীগ নেতারা হয় মাজার জিয়ারত করে নয়তোবা মসজিদে নামাজ পড়ে কোলাকুলির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। ’৭০-র নির্বাচনে বা এর আগের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ বা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতাদের এহেন ধর্মের আশ্রয়ের মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি। দেখে শুনে মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে সেখানকার প্রার্থীরা বাংলাদেশকে অধিকতর মাত্রায় অনুসরণ করতে শুরু করেছেন।

বাংলাদেশের দু’টি শ্লোগান এবারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে স্থান পেয়েছে। এর একটি হল ‘জয় বাংলা’ যা বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশের শেষাংশে শ্লোগান হিসেবে দিয়েছিলেন। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এ শ্লোগানটি দিয়েছেন তার ভাষণের শেষাংশে নিজ নির্বাচনী এলাকা নন্দীগ্রামের জনসভায়। বলেছেন, ‘জয় হিন্দ, জয় বাংলা, বন্দে মাতরম।’ প্রায় সব জনসভায় তিনি একই শ্লোগান দিতে শুরু করেছেন। এ শ্লোগানটি ’৯১ সহ বাংলাদেশের অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি’কে খানিকটা ভিন্নভাবে দিতে দেখা গেছে। তাদের মিছিলে, শ্লোগানে, পোস্টারে, ফেস্টুনে উচ্চকিত ছিল ‘জয় বাংলা জয় হিন্দ লুঙ্গি খুইল্যা ধুতি পিন্দ।’ আওয়ামী লীগও এর পাল্টা শ্লোগান দিতে ছাড়েনি। হিন্দু এলাকা দিয়ে মিছিল নিয়ে যাবার সময় এরা শুধু ‘জয় বাংলা’ বলে আর মুসলিম এলাকা দিয়ে যাবার সময় বলে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ নৌকার মালিক তুই আল্লাহ।’ উভয় বাংলায় নির্বাচনে, রাজনীতিতে এমনভাবে ধর্মের আশ্রয় বাংলা ও বাঙালির মানস গঠনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কিনা তা রাজনীতিকদের ভেবে দেখার সময় এসেছে।

নারায়ণগঞ্জের ডাকসাঁইটে নেতা শামীম ওসমান আজ আর একা নন। সেখানকার মেয়র আইভী রহমানের সাথে তীব্র বিরোধিতায় নেমে হুঙ্কার দিয়েছিলেন এভাবে ‘খেলা হবে।’ এ শব্দ দুটি আজ ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে। নন্দীগ্রামে পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে যেখানেই হুইল চেয়ারে করে সমাবেশ করতে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সেখানেই তিনি বলছেন, ‘খেলা হবে। এক পায়ে খেলা হবে।’ আর এর জবাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিজেপির নেতারাও বলতে শুরু করেছেন ‘খেলা হবে যেখানে আমরা আছি সেখানে।’ বাংলাদেশের সাংসদ, রাজনীতিক শামীম ওসমানের মুখে ‘খেলা হবে’ শব্দ দুটির চয়নে সেখানকার বোদ্ধা জনতা তাকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করায় তিনি মনে মনে নিজেকে কিভাবে ভেবেছিলেন জানি না তবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতি তাকে আশ^স্ত করেছে এই ভেবে যে, ‘খেলা হবে’ শ্লোগানে তিনি আজ একা নন, উভয় বাংলার অগুণতি মানুষ তার সাথে আছে আর ‘খেলা হবে’ এই শব্দ দুটির জনকও তিনি।

আরেক জায়গায় বড় অদ্ভুত মিল। নির্বাচনী রাজনীতির মাঠে বাংলাদেশে শিল্পপতি সালমান এফ রহমান যেমনি আলোচনার বিষয় তেমনি পশ্চিমবঙ্গে শিল্পপতি আম্বানী। আম্বানীকে টার্গেট করেছে তৃণমূল।

মোটা দাগে পার্থক্য শুধু দলবদলে। দলবদল জার্সি বদলের মত বাংলাদেশের নির্বাচনকালেও হয় তবে তা পশ্চিমবঙ্গের মত নয়। কে যে কখন কার কোলে উঠে বসছেন বুঝে উঠা দায় দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত। নির্বাচনী মাঠে লজ্জা শরম আছে বলে মনে হয় না। কোন আদর্শ নয়, ক্ষমতাই হয়ে উঠেছে ব্যক্তি রাজনীতির আকাঙ্খা।

পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনেও ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকটি ফ্যাক্টর তোষণের রাজনীতি। এখন দেখা যাক, খেলা কোন দিকে গড়ায়। একজন জিতবে, আরেকজন হারবে- এটাই ত’ খেলার সর্বশেষ পরিণতি।