নির্বাচন পূর্ব প্রতিশ্রুতি : বর্তমান অবস্থা

38

মনীন্দ্র কুমার নাথ

পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী সকলের মিলিত রক্তস্রোতে আর লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে আজ থেকে ৫০ বছর পূর্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত পর্বে রক্তাক্ত লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সেই গৌরবজনক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা ভাবতে গিয়ে আজ কেমন যেন সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। এদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা পাকিস্তানি হানাদারদের তান্ডবের পর এখন আরেক বৈরি শক্তির কবলে পড়ে দিনের পর দিন নি:স্ব হতে চলেছে। ১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর থেকে মাতৃভূমি থেকে ক্রমান্বয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের  হত্যা, মেয়েদের অপহরণ ও জোর করে ধর্মান্তরকরণ, পৈতৃক ও নিজের অর্জিত ভিটে-মাটি জোর করে দখল, অর্জিত সম্পদ জবরদখলের ঘটনা ঘটছে। চলমান এই সকল ঘটনার বিচার না পাওয়া আমাদের জীবনে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। একটি সভ্য ও অসাম্প্রদায়িক দেশে বিচারহীনতা কাম্য নয়।

গত ২০১৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সত্যিকার মুক্তির লক্ষ্যে সাত দফা দাবি গ্রহণ করেছিল। আমরা বিশ্বাস করি এই সাত দফার মাধ্যমেই পূরণ হবে জাতির জনকের স্বপ্ন।

ঐক্য পরিষদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একান্ত আন্তরিকতায় পাহাড়সম বৈষম্য কিছুটা হলেও দূরীভূত করার জন্য চেষ্টা করছেন, তাও বিরূপ পরিস্থিতি ও ক্ষমতাসীন দলের প্রতিক্রিয়াশীল লোকদের বাধার কারণে আশানুরূপ এগুনো যাচ্ছে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ব্যতীত ১) জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন ২) সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ৩) অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, ৪) পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বাস্তবায়ন ও ৫) পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের  অঙ্গীকার করেছিলেন।

কিন্তু অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হয়, এই চলমান সরকারের দীর্ঘ আড়াই বছরেও এসকল দাবি বাস্তবায়নের জন্য কোন ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি, যা দূর্ভাগ্যজনক।

আমরা জানি একটি মানবিক সরকার বাজেটে ন্যায়সঙ্গত অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে দেশে সমতা সৃষ্টি করে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম ২০২১-২০২২ সালের বাজেটে উল্লিখিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় চলমান প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ রয়েছে ১৮,৯৯০.১০ কোটি টাকা, তার মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য রয়েছে ২৯০.০৮কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১.৫৩%। আমাদের দীর্ঘ দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মঠমন্দিরের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা লক্ষ্য করলাম সেই ২০০ কোটি টাকা পরবর্তী অর্থ বছরগুলিতে বন্টন করে দেখান হচ্ছে। এই বরাদ্দকৃত অর্থের প্রকল্পগুলির কাজ দু-একটি ছাড়া অধিকাংশই মানসম্মতভাবে হচ্ছে না। জেলা পর্যায়ের প্রকল্পগুলির কাজ একেবারেই নিম্নমানের হচ্ছে বলে আমরা খবর পেয়েছি। এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের অবস্থা একেবারেই করুন। এখানকার জনবল এতই অপ্রতুল যে সেখানে জনউন্নয়নে কাজ করার কোন পরিবেশ নাই। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টে নিয়োজিত অধিকাংশই জনবলই অন্য ধর্মাবলম্বীর। যাদের পক্ষে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপলব্ধি করে কাজ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মনেপ্রাণে একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। যোগ্য, সৎ এবং অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছাড়া কখনোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়।

এ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার : ঐক্য পরিষদের ঐতিহাসিক ৭ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের রাজপথের আন্দোলনে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আর নিরব থাকার সময় নেই। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সমঅধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠনসহ সরকারের প্রতিশ্রুত দাবিসমূহ আদায়ের জন্য সারাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আগামি জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই ‘ঢাকায় চল’ শ্লোগানে মুখরিত করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকলকে নিয়ে আমাদের দাবি আদায় করার লক্ষ্যে সাংগঠনিক ও মানসিক প্রস্তুতির উদ্যোগ গ্রহণের এখনই সময়।

লেখক : ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক