ধর্মান্তরিত হলে হিন্দু নারী-পুরুষ সম্পত্তির অধিকার হারাবেন : বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ

53

বিশেষ প্রতিনিধি।। বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেছেন, হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার দিলে জোরপূর্বক ধর্মান্তর বেড়ে যাবে, ধারণাটি ঠিক নয়। বাংলাদেশ লজ রিভিশন অ্যান্ড ডিক্লারেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এ ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনটি বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেনি। কাজেই বর্তমানে যে আইন আছে, তাতে ধর্মান্তরিত হলে হিন্দু নারী-পুরুষ সম্পত্তির অধিকার হারাবেন।

বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) বিকেলে অনলাইনে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এ কথা বলেন হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। খসড়া হিন্দু উত্তরাধিকার আইন-২০২১ নিয়ে এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। জাতীয় পর্যায়ে হিন্দু আইন প্রণয়নে নাগরিক উদ্যোগ কোয়ালিশন এই খসড়া তৈরি করেছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই আইন প্রণয়নে কোনো বাধা নেই। তবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারের পক্ষে এই আইন প্রণয়নও সম্ভব নয়। এর জন্য হিন্দু সমাজ থেকে দাবির বিষয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বেদ যুগে নারীর অবস্থান সমমর্যাদায় স্থান পেয়েছিল। এখনো পাওয়া উচিত। হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকারে সনাতনপন্থীরা বাধা দেন। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সনাতনপন্থীরাই এই ধর্মের মূল চালিকাশক্তি। ধর্মান্তরিত হলে নারী সম্পত্তি পাবে কি পাবে না, এটি সমাধান হওয়া উচিত।

অনুষ্ঠানে সাংসদ আরমা দত্ত বলেন, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে হিন্দু নারীর অধিকার রক্ষা সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। এখন আর পেছন ফিরে তাকানোর সময় নেই।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজল দেবনাথ বলেন, এ দেশে মানবাধিকার, সংবিধানের কথা বলা হয়। তাহলে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। নারীর অধিকার না দিলে সম-অধিকার, সমমর্যাদা থাকে না। তিনি বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনটি মত সুস্পষ্ট। প্রথম , হিন্দু আইনে দাঁড়ি, কমা কোনোটাতেই হাত দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়, যুগের দাবিতে যৌক্তিক সংস্কার ও ধাপে ধাপে এগুনো। তৃতীয়, মানবাধিকারের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে সার্বিক সংস্কার। পারিবারিক আইন বদলাতে যেহেতু সবার মতামত নিয়েই এগুতে হবে, সুতরাং প্রথম মতবাদে বিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, হিন্দু সম্প্রদায় তো ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ, ১৮৫৬ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ , ১৯৩৭ সালে হিন্দু বিধবাদের জীবনস্বত্বে সীমিত অধিকার এবং সর্বশেষ বাংলাদেশে ২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন (ঐচ্ছিক) সংস্কারগুলো করেছে। মেনেও নিয়েছে যৌক্তিক ও যুগের দাবিতে। বেদের যুগে পুত্রের ন্যায় কন্যার উপনয়ন এবং যজ্ঞের অধিকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, হিন্দু আইনে একেবারেই হাত দেওয়া যাবে না, এ যুক্তি তো ঠিক নয়। কাজল দেবনাথ বলেন, তবে বাংলাদেশের বাস্তবতার নিরিখে উত্তরাধিকার আইনে পুত্রের ন্যায় কন্যাকেও সম্পত্তির অধিকার দেওয়ার ব্যাপারে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশের অকাট্য যুক্তি বা শঙ্কাটিও অনস্বীকার্য। সেটি হল, ধর্মান্তর ভীতি ও তার ভয়াবহ পরিণতি। এক কথায় রাজকন্যা ও রাজত্ব দুটোই হারানো পথটিকে আরও সুগম করে ফেলা হবে না তো ? সুতরাং এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই সবাইকে এগুতে হবে।

ঐক্য পলিষদ নেতা আরও বলেন, উপস্থাপিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এর খসড়ায় ১৩ নং ধারায় বলা হয়েছে, ধর্মান্তরিত হলে কোনো হিন্দু নারী, পুরুষ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গ কেউই উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো সম্পত্তি পাবে না।এ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট ও অবশ্যই অপরিবর্তনীয় করার প্রস্তাব রেখে তিনি বলেন,উত্তরাধিকার মানে ইনহেরিট করা। এই ইনহেরিটের সঙ্গে হেরিটেজ-এর বিষয়টিকে মাথায় রাখতে হবে। আমি আমার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহের ঐতিহ্যের পরম্পরা এবং সে কারণেই উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। আমি যদি ধর্মান্তরিত হয়ে আমার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ও পরম্পরা হতে নিজেকে বিচ্যুত করি তাহলে তাঁদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হব এটাই তো স্বাভাবিক। সুতরাং ধর্মান্তরিত হলে পুরুষ নারী নির্বিশেষে সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হবে এটিকে অপরিবর্তনীয় হিসেবে নিয়ে এগুলে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশের মত পাওয়া যাবে এবং হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের সংস্কারে কোনো বাধা থাকবে না। কাজল দেবনাথ আরও বলেন, হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ, বহু বিবাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও যৌক্তিক সংস্কার আজ সময়ের দাবি।

হিন্দু নারীর অধিকার বিষয়টিকে অনেকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত বলেন, হিন্দু ধর্ম যুগের সঙ্গে চলমান ধর্ম। ধর্মান্তরিত করা নিয়ে জুজুর ভয় আছে। এই আইন দ্রুত হওয়া উচিত। আইনের বিষয়গুলো জানতে হবে। তবে আইন নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য পরিষদের সভাপতি দীপালি চক্রবর্তী বলেন, যে দাবিগুলো আসবে, তা অবশ্যই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।

এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সভাপতিত্বে এই ওয়েবিনারে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, ব্লাস্ট পরামর্শক তাজুল ইসলাম, এমজেএফ পরিচালক রীনা রায়, এমজেএফ কর্মসূচি সমন্বয়ক অর্পিতা দাস প্রমুখ অংশ নেন।