ঢাকায় স্বাধীনতা কমপ্লেক্সে ইন্দিরা মঞ্চ তৈরি হবে, মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীর ঘোষণা

6

।। নিজস্ব বার্তা পরিবেশক।। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও ভারতের মহান নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্মরণে শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে ঢাকায় বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে স্বাধীনতা কমপ্লেক্সে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণের স্মৃতি এবং ইন্দিরা মঞ্চ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অচিরেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজও অবিলম্বে শুরু হবে।

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মহিয়সী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজ বাসভবনে দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। সেই দিন স্মরণে জাতীয় প্রেসক্লাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক। বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, ইন্ডিয়ান মিডিয়া করেসপন্ডেন্স এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইমক্যাব)-এর সভাপতি বাসুদেব ধর, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কমান্ডের নেতা আশরাফ আহমেদ লিটন, আওয়ামি লিগ নেতা মতিলাল রায়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য সচিব, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফজলে আলী।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আরও বলেন, ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বলেই একাত্তরে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ ভারতের মাটিতে আশ্রয় পেয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পেয়েছে এবং ন’মাসে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। আমেরিকা ও চীনের মতো দুই পরাশক্তি পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। সেই ইন্দিরাকে আমরা সেভাবে স্মরণ করছি না, এটা আমাদের ব্যর্থতা। তবে বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক কমিটি আজকের আয়োজনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও আমাদের দায়মুক্ত করেছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো নজির নেই যুদ্ধের পর মিত্রবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকালেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। সাদ্দামের হুমকির মুখে আমেরিকা সৌদি আরবে সেনা পাঠিয়েছিল, আজও সেখানে মার্কিন সেনা রয়েছে। ইতিহাসে একমাত্র ব্যতিক্রম ভারত। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় মিত্রবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনে, পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে মিত্রবাহিনী দেশে ফিরে যায়। গণতান্ত্রিক ভারতের নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শিতার কারণে তা সম্ভব হয়েছে।

মন্ত্রী চীনের নাম উল্লেখ না করে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পাশে ছিল না অনেক দেশ। তাদের সঙ্গে আজ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি সেই একাত্তর, যে সময় মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র সেনাদের রক্ত এক হয়ে গিয়েছিল। এই রক্ত কখনো পৃথক হতে পারে না।

মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বাংলাদেশের মানুষের মা। আমরা যারা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, আমরা জানি এই মহিয়সী নেত্রী ছিলেন বলেই আমরা সহজেই পাকিস্তানিদের কাবু করতে পেরেছি। ‘আমাদের এই মায়ের’ যাত্রাপথ সহজ ছিল না, এক ভয়াবহ বৈরি সময় তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি আমাদের পাশে থেকে সরে যাননি।

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, ইন্দিরা গান্ধী শুধু একাত্তরেই পাশে ছিলেন না, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সব দুঃসময়েও পাশে ছিলেন। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন নিহত হন, তখন দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশে ছিলেন না। জার্মানিতে ছিলেন। পৃথিবীর কোনো দেশ তাঁদের আশ্রয় দেয়নি। ইন্দিরা মাতৃ¯েœহে তাঁদের দিল্লি নিয়ে এসে আশ্রয় দেন, সসম্মানে  সপরিবারে থাকার ব্যবস্থা করেন। তাঁদের নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করেন।

যুগান্তর সম্পাদক সায়ফুল আলম বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর হত্যাকারীরা ইতিহাস বিকৃত করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। ইতিহাস নিজস্ব গতিতে চলে। ষড়যন্ত্র কখনো সফল হয় না।

বাসুদেব ধর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, চীনের অস্ত্রে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা ত্রিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। চীন সা¤্রাজ্যবাদী দেশে পরিণত হয়েছে। চীনের সঙ্গে ভারতের গভীর বন্ধুত্ব ছিল, ইন্দি-চিনি ভাই ভাই শ্লোগান উঠত, হঠাৎ ১৯৬২ সালে ভারত আক্রমণ করে বসল। ভারতের কোনো মানুষ ভাবতে পারেনি, চীন হামলা চালাবে। আজ বিশ্ব জুড়ে আগ্রাসি থাবা বিস্তৃত করতে চাইছে চীন।  আমাদের জাতির পিতা নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভ ঠেকাতে বারবার ভেটো দিয়েছে। সেই চীন বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে না। তিনি ঢাকায় ইন্দিরা গান্ধীর নামে একটি সড়কের নামকরণের দাবি জানান।

সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক বলেন, এই আলোচনা সভা আয়োজনের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করেছি যে, বাঙালি জাতি অকৃতজ্ঞ নয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে নেমে বলেছিলেন যে, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর মিল আদর্শের, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শের মিল। এটাই দুদেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল করতে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, ভারতের মানুষ তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছিল। দুঃখ-দুর্দশা ভাগ করে নিয়েছিলেন। ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন।