ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক কার্টুনিস্ট কিশোর জামিন পেলেন

7

ডেস্ক রিপোর্ট ।।  বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ও আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যে এই আইনে প্রায় এক বছর আগে আটক হওয়া কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে জামিন দিয়েছে ঢাকার হাইকোর্ট। বুধবার (৩ মার্চ) এক আদেশে কিশোরকে ছয় মাসের জন্য জামিন দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো ছাড়াও জাতির জনকের প্রতিকৃতি, জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় পতাকাকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। কার্টুনিস্ট কিশোরের ভাই আহসান কবির জানিয়েছেন যে, উচ্চ আদালত কার্টুনিস্ট কিশোরকে ছয় মাসের জামিন দিয়েছেন।

এর আগে কার্টুনিস্ট কিশোর ও একই মামলার আসামি লেখক মুশতাক আহমেদের ছয়বার জামিন আবেদন নাকচ হয়েছিলো আদালতে। মুশতাক আহমেদ কারাগারে থাকাকালে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি  মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও এই আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। কারা হেফাজতে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশে ১৩টি পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানরা। গত শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গত বছরের ৫ মে থেকে মুশতাক আহমেদ কারাবন্দি ছিলেন। বেশ কয়েক বার তার জামিন আবেদন খারিজ হয়েছে। কারাবন্দি থাকা অবস্থায় তার চিকিৎসা নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। আমরা তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। আমরা বাংলাদেশ সরকারকে এই ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।

বিবৃতিতে কূটনীতিকরা বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে মান প্রশ্ন তোলা হবে। বিবৃতিতে সই করেছেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার, ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি চুয়ার্ড, কানাডার হাইকমিশনার বেনোইত প্রিফনটেইন, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি এসটার্প পিটারসন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসে তেরিঙ্ক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মেরিন সুউহ, জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহরেনহোল্টজ, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতো, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভারউইজ, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-এসভেন্ডসেন, স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো ডা আসিস বেনিটেজ সালাস এবং সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্দ্রা বার্গ ভন লিন্ডে।

অন্যদিকে লেখক মুশতাক আহমেদের কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা দ্রুত, স্বচ্ছ এবং স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। এছাড়া, কারাবন্দি কার্টুনিস্ট কিশোরের নিঃশর্ত মুক্তির দাবির পাশাপাশি তাকে কারা হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগের তদন্তও চেয়েছে সংস্থাটি। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ অবশ্য এই উদ্বেগের সমালোচনা করেছেন।

মামলার এজাহারে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) দাবি করেছে, ‘আই এম বাংলাদেশি’ নামে একটি ফেসবুক পাতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণœ করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা জানা সত্ত্বেও গুজবসহ বিভিন্ন ধরণের পোস্ট দেয়া আছে যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ও আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়।

এজাহারে আরও বলা হয়, আই এম বাংলাদেশি পেজ পর্যালোচনা দেখা যায় পেজটির এডমিন সায়র জুলকারনাইন এবং আহমেদ কবির কিশোর, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ, মুশতাক আহমেদ নামের ফেসবুক আইডিসহ পাঁচজন এডিটর পরস্পর যোগসাজশে উক্ত ফেসবুক পেজটি পরিচালনা করে আসছে। আলামত পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট, মহামারি করোনা ভাইরাস, সরকার দলীয় বিভিন্ন নেতার কার্টুন দিয়ে গুজব ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়, তখন থেকেই গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ৫০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করেছে র‌্যাব ও অন্য বাহিনী। ২০২০ সালের ৫ মে লেখক মুশতাক আহমেদ, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল ইসলাম ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নানকে আটক করে র‌্যাব। পরে দিদারুল ইসলাম ও মিনহাজ মান্নান জামিনে মুক্তি পেলেও জামিন পাননি মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট কিশোর। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার মুশতাক আহমেদ কারাগারেই অসুস্থ হয়ে মারা যান।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে উদ্বেগ ছিল শুরু থেকেই। কিশোর একজন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী কার্টুনিস্ট, যিনি সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের নীতির সমালোচনামূলক কার্টুন আঁকার কারণে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছিলো। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘লাইফ ইন দ্য টাইম অব করোনা’ যা তার ফেসবুক পেজ ‘আই অ্যাম বাংলাদেশি’তে প্রকাশিত হয়। এতে ক্ষমতাসীন দলের নানা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা করা হয়। ২০০৫ সালে দেশের একমাত্র কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ কার্টুনিস্টদের জন্য পদক প্রবর্তন করে এবং প্রথম এই ‘উন্মাদ’ পদক পেয়েছিলেন আহমেদ কবির কিশোর।

স্বৈরাচার ও জামায়াত-শিবির-রাজাকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে কার্টুন প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন। তার আঁকা কার্টুন নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জামায়াত-শিবির-রাজাকারবিরোধী একাধিক প্রদর্শনী হয়েছে।

দৈনিক প্রথম আলো বলেছে, ইতিপূর্বে কারাগারে থাকা কার্টুনিস্ট কিশোর অসুস্থ বলে জানিয়েছিলেন তার ভাই আহসান কবির। তিনি সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানান, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কিশোর ও মুশতাকদের ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়েছিল। তখন তিনি কিশোরকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেন। তাকে কিশোর বলেছেন, গ্রেপ্তারের পর নির্যাতন করা হয়েছে, যার কারণে তার পায়ে সংক্রমণ হয়েছে। কানে পুঁজ হচ্ছে। তার ডায়াবেটিস অনেক বেড়ে গেছে। চোখেও কম দেখছেন। তার দ্রুত চিকিৎসা দরকার।