জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের আইটি বিশেষজ্ঞ গ্রেপ্তার

0

ডেস্ক রিপোর্ট।। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক (আইটি) বিশেষজ্ঞ সাখাওয়াত আলীকে চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। পুলিশ বলছে, তিনি চার বছর আগে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে সিরিয়ায় যান সাখাওয়াত। গত মার্চ মাসে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

শুক্রবার (১১ জুন) রাতে নগরের দক্ষিণ খুলশী এলাকা থেকে সাখাওয়াত আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এজাহারে বলা হয়, ২০১২ সালে ভায়রাভাই মোহাম্মদ আরিফ মামুনের মাধ্যমে জঙ্গি তৎপরতায় সম্পৃক্ত হন সাখাওয়াত। সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ও বর্তমানে জঙ্গি সংগঠনের নেতা মেজর জিয়াসহ অন্যদের মাধ্যমে জিহাদি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। এরই অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে আরিফ তুরস্কে যান। সেখান থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে হায়াত তাহরির আশরাকের কাছ থেকে ভারী অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। আরও বলা হয়েছে, সিরিয়ার ইদলিব এলাকায় ছয় মাস প্রশিক্ষণ নেন। পরে সিরিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়ায় আসেন। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে আবার ইন্দোনেশিয়ায় যান।

এ ঘটনায় সংস্থাটির উপপরিদর্শক (এসআই) রাছিব খান বাদী হয়ে খুলশী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। বলেন, সিরিয়া থেকে এসে দেশে অবস্থান করছেন এ খবর পেয়ে সাখাওয়াতকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও জানা যায়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্র, ইসলামি দল ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে থাকা তরুণদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় আনসার আল ইসলাম।

সম্প্রতি পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) আল-কায়েদাপন্থী এই জঙ্গি সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করেছে। তাতে সংগঠনটির এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা গেছে। কাগজপত্রে কর্মীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, কেবল বন্দুক আর বারুদের মধ্যে একবিংশ শতাব্দীর ‘যুদ্ধ’ সীমাবদ্ধ নয়। এখন ভাষায় ও জ্ঞানে, কাজে ও কৌশলে দক্ষ হতে হয়। তাই সংগঠনটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ‘চৌকস’ ও ‘বিচক্ষণ’ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। তারা সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে।

সদস্য হিসেবে আনসার আল ইসলাম কাদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, সে সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্র, ইসলামি দল ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে থাকা তরুণদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। দলে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তির জন্য এক বছরের প্রশিক্ষণের শর্ত রয়েছে। এর আগে কখনো আনসার আল ইসলাম নারীদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলেনি। তবে এবারই প্রথম সংগঠনটি তাদের প্রচারপত্রে পুরুষ ও নারী দুই পক্ষকে উদ্দেশ্য করে বার্তা দিয়েছে।

গত দুই মাসে সিটিটিসি আনসার আল ইসলামের সাতজন সদস্য ও একজন উগ্রবাদী বক্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সরকারি কলেজের ছাত্র ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক রয়েছেন।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার আহমেদুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি নেতা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক ব্যক্তিগত যোগাযোগ রাখেন, এমন দুজন কর্মী বাকী বিল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম ওরফে জাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাকী বিল্লাহ রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন, পড়ালেখা শেষ করেননি। তবে প্রযুক্তিজ্ঞানে খুবই দক্ষ।

সিটিটিসির আরেক উপকমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানগুলো থেকে পুলিশ যে তথ্য পাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে আনসার আল ইসলাম শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী তৈরিতে মনোযোগী হয়েছে। সমর্থক গোষ্ঠী তৈরিতে তারা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। তারা বলছে, এই মুহূর্তে তাদের কাজের ৮০ ভাগই মিডিয়া বা প্রচার বিভাগের।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, আনসার আল ইসলামের এ-দেশীয় সমন্বয়ক হলেন মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। ২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যার মাধ্যমে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দলটি মোট নয়টি হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল। সবশেষ ২০১৬ সালের এপ্রিলে কলাবাগানে বাসায় ঢুকে ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বীকে খুন করে দলটির লোকজন। পুলিশ বলছে, জিয়াউল হক বছরে তিন-চারবার কর্মীদের বার্তা পাঠান। তার সর্বশেষ বার্তাটি গত বছরের ২৯ রমজান সংগঠনের কর্মীরা পায়।

২০১৩ সালে আল-কায়েদা ‘জিহাদের সাধারণ নির্দেশনা’ প্রকাশ করেছিল। ওই নির্দেশনায় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়ার নির্দেশ ছিল। জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের আনসার আল ইসলাম আল-কায়েদার মতাদর্শ ও নির্দেশনা অনুসরণ করে থাকে। তারা যেসব ইস্যুতে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষোভ-দুঃখ-হতাশা রয়েছে সেসব বিষয়ে জনমত গঠন, সমর্থক গোষ্ঠী তৈরির পর সেখান থেকে কর্মী বাছাই এবং মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চায়। দেশের ভেতর আলেমদের সঙ্গেও জোট বাঁধার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান আছে এমন লোকজন তাদের বিশেষ পছন্দের।