কানাডায় ‘বেগমপাড়ার সাহেবদের’ ধরতে শেখ হাসিনার নির্দেশ

12

।। বিশেষ প্রতিনিধি।। আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন,  কানাডার ‘বেগমপাড়া’র (টরন্টোয় যেখানে বাংলাদেশিরা দামি বাড়ি-গাড়ি কিনে ছেলেমেয়েদের রেখেছেন, কিন্তু নিজে থাকেন এখনো বাংলাদেশে) সাহেবদের ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্নীতি দমন কমিশনকে এ ব্যাপারে সার্বিক তদন্ত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, কানাডার ‘বেগমপাড়া’য় যারা অর্থপাচার করেছেন, তাদের মধ্যে সরকারি আমলার সংখ্যা বেশি।

বিষয়টি নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নজরে আনার পর থেকেই সক্রিয় হয়েছে সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে যাদের নাম আসবে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, যারা অর্থপাচার করেছেন, তাদের পরিচয় অর্থপাচারকারী। এর মধ্যে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা থাকেন, সরকারের কাছের লোক থাকেন- তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন সময় বাংলাদেশ থেকে কানাডায় অর্থ পাচারকারী ২৮ জনের তথ্য থাকার কথা জানালেন, যখন কানাডার সন্দেহভাজন আর্থিক লেনদেন দেখভালের দায়িত্বে থাকা ফেডারেল সংস্থা ফিনট্র্যাক (দ্য ফাইন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশনস অ্যান্ড রিপোর্ট অ্যানালাইসিস সেন্টার অব কানাডা) মুদ্রা পাচারের ১ হাজার ৫৮২টি ঘটনা চিহ্নিত করেছে। ফিনট্র্যাক এই ১ হাজার ৫৮২টি মুদ্রা পাচারের ঘটনার তথ্য কানাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, তার কাছে ২৮টি ঘটনার তথ্য সংগ্রহে আছে। গত বছরের শেষে টরন্টোয় লুটেরাবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সময় বিশ্বব্যাপী মুদ্রা পাচার নিয়ে কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টজ (আইসিআইজে) এর সঙ্গে জড়িত কানাডীয় কয়েকজন সাংবাদিক অনানুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই সব আলোচনায় কানাডার প্রভাবশালী একটি পত্রিকার একজন সাংবাদিক জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে সন্দেহভাজন মুদ্রা পাচারকারী ২০০ বাংলাদেশির একটি তালিকা আছে। তালিকা ধরে তারা তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করার কাজ করছেন।

কানাডা থেকে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, টরন্টো থেকে গার্ডিনার এক্সপ্রেস ধরে মাত্র ৪০ কিলোমিটারের দূরত্বে এমন সিনেমাটিক জীবন যাপন করছেন বেশ কিছু বাংলাদেশি। না, তারা যে কানাডায় অনেক বছর ধরে আছেন, তুমুল জীবনসংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা নয়। তাদের অধিকাংশই কানাডায় এসেছেন গত কয়েক বছরে এবং বাড়িগুলো কেনা হয়েছে এ সময়েই। কানাডায় তাদের দৃশ্যমান তেমন আয়ের কোনো উৎস নেই। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন বিভাগের বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তা। গত ৫-৬ মাসে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা কানাডায় এসেছে, গত কয়েক বছরেও তা আসেনি, এমন কথা এখন টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে সেগুলো ফেরত না দিয়ে কানাডায় পাচার করে আয়েশি জীবন যাপন করা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে গত বছরের শেষের দিকে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়, তখন বাংলাদেশের সরকারি পর্যায় থেকে সেই আন্দোলনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করলেও সংসদের আলোচনায় কিংবা গণমাধ্যমে সেটি তেমন গুরুত্ব পায়নি। ঢাকায় সরকার যেমন এই বিষয়ে নীরব থেকেছে, তেমনি কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনসাল জেনারেল অফিসও ওই আন্দোলন থেকে নিজেদের যতটা সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখে। কিন্তু এবার সরকারের খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি অর্থ পাচার নিয়ে কথা বলেছেন, যার সিংহভাগ পাচারকারী সরকারি কর্মকর্তা, এর পরই কানাডায় অর্থ পাচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এমনকি উচ্চ আদালত পর্যন্ত এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

জানা গেছে, ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, শেয়ারবাজারের ব্রোকার, রিয়েল এস্টেট ব্রোকারেজ এবং ক্যাসিনো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ফেডারেল সংস্থাটি অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে মুদ্রা পাচারের ঘটনা উদ্ঘাটন করে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, কোভিডের মধ্যেও বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে কানাডায় আসছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে ফিনট্র্যাক বাড়তি তদন্ত শুরু করে। রিয়েল এস্টেট ব্রোকারেজগুলোয় গোয়েন্দাদের বাড়তি নজর রয়েছে বলে জানা যায়। কোভিডে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই কানাডার অর্থনীতি প্রবল চাপের মধ্যে থাকলেও রিয়েল এস্টেট বাজার যথেষ্ট চাঙা রয়েছে। টারানেট-ন্যাশনাল ব্যাংকের ইনডেক্সের তথ্য অনুসারে, পুরো কানাডায় অক্টোবর মাসে বাড়ির দাম ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, করোনার মধ্যে অর্থনীতি চাপে থাকা সত্ত্বেও কানাডায় বাড়ি বাজার এত চাঙা হলো কিভাবে ? কারা কিনছেন এই বাড়ি ? বলা হচ্ছে, গত ৫-৬ মাসে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা কানাডায় এসেছে, গত কয়েক বছরেও তা আসেনি।

বাংলাদেশের সেই সাংবাদিক বেগমপাড়ার শান-শওকতের বর্ণনা দিতে গিয়ে আরও বলেছেন, ম্যানসন আকৃতির আলিশান বাড়ির সামনে ড্রাইভওয়েতে হাল মডেলের দামি গাড়ি আর পেছনে নোঙর করা ব্যক্তিগত স্পিডবোট। বাড়ির পেছন দিয়ে বের হয়েই ব্যক্তিগত বোটে লেকে ঘুরে আসা যায়। কিংবা ড্রাইভওয়েতে পার্ক করে রাখা অতি দামি গাড়ি নিয়ে শাঁই শাঁই করে ছুটে যাওয়া যায় যেকোনো দিকে। এমন দৃশ্যের বর্ণনা দিলে যে কেউ এটিকে কোনো সিনেমার দৃশ্য হিসেবেই বিবেচনা করবেন।