এবারে পূজোর দিনকাল কেমন কাটবে

16

রানা দাশগুপ্ত

করোনাভাইরাস অতিমারীতে বিশ্বজনীন পরিস্থিতি আজ টালমাটাল। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিতে বেহাল দশা। এ মহামারীর সেকেন্ডওয়েভ সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এমনতোরা পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, এবারে পূজোর দিনকাল কেমন কাটবে?।

হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ শ্রীশ্রী চন্ডী’তে দেবী দুর্গার মাহাত্ম্যের বর্ণনা আছে। হিন্দু ধর্মসম্প্রদায়ের কারো কারো বিশ্বাস, প্রাচীনকালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার করলডেঙ্গা পাহাড়ের মেধস মুনির আশ্রমে দুর্গাপূজোর সূচনা ঘটেছে। তা-ও বসন্তে। শরতে মা দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন রামচন্দ্র রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধারের মানসে। সেকাল থেকে শারদীয়া দুর্গোপূজোর শুরু। শরতের শুভ্রতার সাথে মায়ের বন্দনা পূতপবিত্র পরিবেশের জন্ম দেয় বৈকি। এজন্যে বঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে শরৎকালের দুর্গাপূজো বহুলভাবে সমাদৃত। বসন্তকালের দুর্গাপূজো ‘বাসন্তী পুজো’ নামে আজো প্রচলিত।

সামন্ত রাজা জমিদারদের আমলে শারদীয়া দুর্গাপূজো রাজদরবারের উৎসবে রূপান্তরিত হয়। প্রজাবৎসল এসব সামন্তপ্রভুরা বছরের কয়েকটি দিন রাজা-প্রজা নির্বিশেষে মিলিত হয়ে পুজোর ধমীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাইরে হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠতো। অর্ধ সহস্রাধিক বছর আগে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ দেবীদুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে সে সময়ের  ৯লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রথমবারের মতো এ উৎসবের আয়োজন করেন। সামন্ত যুগের অবসানে পুজোর আয়োজন রাজা-জমিদারদের অংগনের বাইরে চলে আসে। এলাকাভিত্তিক পূজার্থীদের সমবেত আয়োজনের  মধ্যে শুরু হয় বারোয়ারী দুর্গাপূজো। তা-ও খুব বেশীদিন আগের কথা নয়, নিদেনপক্ষে ১০০ থেকে ১২৫ বছর আগের। বারোয়ারী পুজো কালের পরিক্রমায় সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্মসম্প্রদায় নির্বিশেষে বাঙালির মহামিলনে মহা আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয় এ সময়ে। পারস্পারিক মেলবন্ধনে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা বাঙালি সংস্কৃতিতে নতুন উপাদান যুক্ত করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবে বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’।

ষষ্ঠী থেকে দশমী-শারদীয়া দুর্গাপূজোর এ পাঁচদিন প্রতিদিন সকাল থেকে বেলা দেড়টা-দু’টো পর্যন্ত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান চললেও বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাতৃবন্দনা ও শারদোৎসব। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাঙালির এ এক মহোৎসব।

করোনাভাইরাসের অতিমারীতে পূজার্থীরা মা দেবীদুর্গার আরাধনায় এবারে নিমগ্ন থাকলেও উৎসবের আয়োজন থেকে নিজেদের নিবৃত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  ২২ অক্টোবর থেকে শারদীয়া দুর্গাপুজো শুরু হ”েছ। ২৬ অক্টোবর প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটবে। এবারে মা আসছেন পিত্রালয়ে মর্তে দোলায় চড়ে। আর বিদায় নেবেন ধীর শান্ত গজ চড়ে। শাস্ত্রমতে গজ অর্থাৎ হাতিতে চড়ে মায়ের বিদায় শুভ। বসুন্ধরা শষ্য শ্যামলায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আর মায়ের আগমন দোলায় অর্থাৎ মড়কে। বাস্তব পরিস্থিতি তারই ইংগিত দেয়।

বাংলাদেশের সকল পুজো কমিটির সমন্বয়কারী সংগঠন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ বর্তমানের করোনা অতিমারীর প্রেক্ষাপটে পূজার্থী ভক্তদের নিজেকে সুরক্ষিত রাখা এবং মানুষকে তা’ থেকে সুরক্ষায় সহযোগিতা করার লক্ষে মাসখানেক আগে পূজার্থী জনগণের কাছে অনুরোধ সম্বলিত যেসব নির্দেশনা প্রেরণ করেছে সময়ের বিবেচনায় তা যথার্থ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে প্রতি বছরের মতো এবারও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। আমন্ত্রিত হয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ এতে যোগ দিয়েছিলেন। বৈঠকে সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাক্রমে এবারের অতিমারীকে বিবেচনায় রেখে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা বর্জনের উপর জোর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সারা দেশের পুজো কমিটিসমুহের কাছে প্রেরিত নির্দেশনায় যথার্থভাবে বলেছে, ‘ধর্ম জীবনের অঙ্গ। তবে ধর্ম পালনের জন্যে নিজের এবং পাশের জনের জীবনের সুরক্ষা অপরিহার্য। দুর্গাপূজোয় জনসমাগমের কারণে করোনার বিস্তার ঘটেছে এ ধরনের কোন অভিযোগ যাতে সম্প্রদায়ের ঘাড়ে না চাপে সে বিষয়ে অবশ্যই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’ এতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-

ক.           পুজোমন্ডপে পূজার্থী ভক্তদের প্রবেশের সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে, হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজার, মাস্ক বাধ্যতামুলক করতে হবে;

খ.            পুজোমন্ডপের সংখ্যা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে এবং সীমিত পরিসরে পুজোর ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে;

গ.            আইন-শৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা আইন-শৃংখলা মোকাবেলায় মোবাইল ডিউটিতে থাকবে বিধায় মন্দির/ মন্ডপের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃংখলা সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষকে নিজ দায়িত্বে করতে হবে;

ঘ.            পুজোমন্ডপে জনসমাগম হ্রাসের জন্যে অঞ্জলি প্রদান অনুষ্ঠান টিভি চ্যানেল-এ লাইভ প্রচারে যদ্দুর সম্ভব উদ্যাগ গ্রহণ করতে হবে এবং মন্দিরের স্থান সংকুলান সাপেক্ষে ২৫ থেকে ৫০ জনের মধ্যে অঞ্জলি দান সীমাবদ্ধ রাখতে হবে;

ঙ.           শোভাযাত্রর মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জন করা যাবে না;

চ.            ধর্মীয় সম্প্রতি রক্ষা করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে;

ছ             সন্ধ্যার পরে দর্শনার্থীদের মন্দিরে/ মন্ডপে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে হবে। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মহামান্য হাইকোর্ট এ ব্যাপারে সেদেশে নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের এসব নির্দেশনা মেনে নিয়ে করোনাকালীন বাস্তবতাকে যথার্থ অর্থে পূজার্থীরা এবারের শারদীয়া দুর্গাপুজোয় মেতে উঠবেন-এ প্রত্যাশা সকলের। মনে রাখতে হবে-জীবন বাঁচলেই ধর্ম বাঁচবে। এর কোন অন্যথা নয়।

 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ