একজন প্রিয় ছাত্রের চোখে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

9

||পঙ্কজ ভট্টাচার্য ||

শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামানের সাথে পরিচয় ১৯৬০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা (সম্মান) ক্লাসরুমে। তখন তিনি তরুণ প্রতিভাদীপ্ত শিক্ষক। আমার টিউটরিয়াল ক্লাসও নিতেন তিনি। এক ঝাঁক দেশবরেণ্য শিক্ষক ছিলেন তখন বাংলা বিভাগে। ড. আবদুল হাই, ড. মুনীর চৌধুরী, ড. আহমদ শরিফ, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. আনিসুজ্জামান, ড. রফিকুল ইসলাম, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল প্রমুখরা আমাদের শিক্ষক ছিলেন। বিশেষ করে মুনীর চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম, ড. আহমদ শরিফ ও ড. আনিসুজ্জামানের ক্লাস ছিলো খুবই আকর্ষণীয় ছাত্রদের কাছে। বিষয়বস্তুর প্রাঞ্জল ও প্রাণবন্ত উপস্থাপনা এবং ছাত্রদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ দরদী ব্যবহার ক্লাসগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল। এঁদের ক্লাস জানা মতে ফাঁকি দিই নাই, চুম্বকের মতো টানতো ছাত্রদের।

ড. আনিসুজ্জামানের সাথে ক্লাসের বাইরেও ঘনিষ্ঠতা হয়, পড়াশোনার বিষয় তো বটেই, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী, এশিয়াটিক  সোসাইটিতে সময় নিয়ে সম্যক ধারণা পেতে সাহায্য করতেন।

সেরা শিক্ষকের অন্যতম ড. আনিসুজ্জামান ছাত্রদের সাথে অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ আচরণ করতেন, ছাত্রদের ব্যক্তিগত সমস্যা-সংকট জানার চেষ্টা করতেন, প্রয়োজনীয় বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন। পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের ধকল চেহারা ও পোষাকেআসাকে ধরা পড়লে স¯েœহে বলতেন ‘চোখমুখ ধুয়ে সুস্থির হয়ে আসুন’। এমন সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ ড. আনিসুজ্জামানের বৈশিষ্ট্য ছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তাঁর তেজোদীপ্ত ভূমিকা পালন ও কারারুদ্ধ থাকার কাহিনী ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি বইপুস্তক থেকে, কিন্তু আলাপচারিতায় তিনি এই প্রসঙ্গে সহাস্য নিরবতা দেখিয়েছেন। এমনকি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা ড. আনিসুজজ্জামানের ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী কালের ভূমিকা নিয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা, কারাজীবনের সাথী হিসেবে উচ্চ মূল্যায়ন আমরা শুনেছি, এমনকি ভাষা আন্দোলনের পূর্বে ১৯৪৮ সনে গণতান্ত্রিক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালে তাঁর অনন্য ভূমিকা বিশেষত গণতান্ত্রিক যুবলীগের ঘোষণাপত্র প্রণয়ন ছিলো ড. আনিসুজ্জামানের আরেক কীর্তি। ১৯৭২ সনে প্রণীত ও জাতীয় সংসদে গৃহীত সংবিধানটির বাংলাভাষ্যটি যে তাঁরই এক মহৎকীর্তি তা স্বর্ণাক্ষরে রয়েছে জাতীয় জাদুঘরে, জাতি কোনদিন তাঁর এই কীর্তি ভুলতে পারবে না।

প্রতিবেশী ভারত সরকার শিক্ষাবিদ, সুলেখক ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব ড. আনিসুজ্জামানকে পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করেন।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত ড. আনিসুজ্জামান জাতীয় এবং চট্টগ্রাম শাখা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ২৫ মার্চের পর চট্টগ্রাম সোয়াত জাহাজের মাধ্যমে পাকিস্তানী অস্ত্র সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আন্দোলনরত সব মহলের সাথে যোগাযোগ রাখতেন, এপ্রিল মাসের শেষার্ধে দূর্গম অরণ্য পথে চট্টগ্রাম থেকে আগরতলা আসেন, নিজের গাড়ীটি নিয়ে আসেন তিনি। আগরতলা আওয়ামী লীগ জনপ্রতিনিধি এবং ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের ক্র্যাফ্ট হোষ্টেল ক্যাম্পে তিনি যোগাযোগকরেন। পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকারের আমন্ত্রণে কোলকাতায় উপস্থিত হয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতি সংক্রান্ত কাজকর্মে যুক্ত হন, একই সাথে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকবৃন্দ সহ পেশাজীবিদের সংগঠন এবং পশ্চিম বঙ্গের কৃতি বুদ্ধিজীবিদের সমন্বয়ে সমন্বিত নাগরিক সহায়তা কমিটি গঠনে উদ্যোগী হন। লেখক অন্নদাশংকর রায় এহেন উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র সময়কালে মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমিতি অর্থ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে।

ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন মানবমুক্তির পথে শোষণ-মুক্ত এক মানবিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজের অনুসারী। এই বিশ্বাস থেকে তিনি তিলমাত্র সরে আসেননি। বিশ্বপরিসরে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় সত্ত্বেও শোষণমুক্তির আদর্শের বিকল্প নেই বলে তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করতেন।

অগ্রসর বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে (মুজিবনগর সরকার থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আমলেও ) তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমর্পিত। সরকারের বাইরে থেকে রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে, জাতির অন্যতম বিবেক হিসেবে প্রতিটি সংকট-সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছেন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। কখনও ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ নামে, কখনও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের একমাত্র উপদেষ্টা হিসেবে, এমনকি নাগরিক উদ্যোগ হিসাবে অন্যান্য বিশিষ্টজনকে নিয়ে শুধু প্রতিবাদ নয়, প্রতিকারের প্রকৃষ্ট পথ দেখিয়ে গেছেন আমৃত্যু।

আমি গর্বিত এই কারণে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন কালে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি, রাজনীতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে কোন সমস্যায় তাঁকে অভিভাবক হিসেবে, জাতির কান্ডারি হিসেবেতাঁর পরামর্শ-সহায়তা-সাহায্য থেকে বঞ্চিত হইনি। ২০০১ সনে নির্বোচনোত্তর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক নির্যাতন যখন তুঙ্গে তখন তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গেছেন ক্লান্তিহীনভাবে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ উচ্চারণকরেছেন, প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত হননি, সুনির্দিষ্ট পথ দেখিয়েছেন রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসনকে। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে নিরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে তিনি নাগরিক কর্তব্য পালনে উদ্যোগী হতেন। ২০০১ সনের সাম্প্রদায়িক নির্যাতন নিয়ে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনসহ অন্যান্য ব্যক্তিত্বদের সাথে নিয়ে ‘জাতীয় তদন্ত কমিশন’ গঠন করে নিরপেক্ষ তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে তা নথিবদ্ধ করে ‘নির্যাতনের দলিল-২০০১’ এবং ‘কমিশন রিপোর্ট’ প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকি, এ্যাড. তোবারক হোসেন, অজয় রায়, ড. অজয় রায় প্রমুখরা। আমি অনেকের সাথে নূর মোহাম্মদ তালুকদার, জিয়াউদ্দিন তারিক আলী প্রমুখদের সাথে কর্মী হিসেবে নির্যাতিত নারী-পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। শুধু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ড. আনিসুজ্জামানের অতন্দ্র ভূমিকা কেবল মাত্র নয়, স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে, নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক দোষীদের শাস্তি প্রদানে বাধ্য করতে জনমত সৃষ্টি করেছেন বছরের পর বছর ধরে নিরলসভাবে। জাহানারা ইমামের যুদ্ধাপরাধীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আন্দোলনে বিশেষত: গোলাম আজমের বিচারের দাবিতে গণ-আদালতের সংগ্রামেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষা, সংস্কৃতির আর সামাজিক অন্যান্য সংস্কার সহ দাবি দাওয়াতেও ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন সোচ্চার। দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন, অত্যাচার, ভূমিদখল, উচ্ছেদ, নারী নির্যাতনসহ যে সকল ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়তভাবে তার বিরুদ্ধে ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন প্রতিবাদী উচ্চকন্ঠ।

আমি তাঁর একজন ছাত্র একারণে আমার ৮০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে তিনি পৌরাহিত্য করেছিলেন  ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও। দীর্ঘ তিন ঘন্টা ধরে সভায় সভাপতিত্ব করেছেন, ক্লান্তি-অবসাদ সয়েছেন হাসিমুখে। ৫ মিনিট বক্তব্য রেখে সভা শেষ করেছেন- এ কথা ভুলি কেমনে? শুধু এক্ষেত্রে নয়, অধিকাংশ সভায় ড. আনিসুজ্জামানকে সভাপতি করে দু’তিন ঘন্টা আটকে রেখে একে একে বক্তৃতা শেষে বক্তারা চলে যাচ্ছেন এ অনৈতিক ঘটনা প্রায়ই লক্ষ্য করেছি বেদনার সাথে।

ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুর পরে জেনেছি তিনি ঘাতক করোনার শিকার হয়েছেন, ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্বান্ধব তাঁর শেষ যাত্রায় শরিক হতে পারেনি তাঁর পরিবার-ভক্ত-অনুরক্ত-অনুসারীরা। কিন্তু সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর পদচারণা, তাঁর সংযত অথচ সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আজও আমরা মানবিক গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার অনুসারীরা ড. আনিসুজ্জামানের প্রদর্শিত পথেই হাঁটছি-হাঁটতে হবে অবিচল।

তাঁর অমর স্মৃতিতে অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।

লেখক : ঐক্যন্যাপ সভাপতি ও সভাপতিম-লীর সদস্য, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ