আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় : প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ

57

ড. জিনবোধি ভিক্ষু

জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই আলো। এ জ্ঞানের আলো বিশ্বের সমস্ত অপশক্তিকে পরাভূত করে। এর মূল কেন্দ্র বিন্দু হল মানুষ। মানুষকে মানুষের মতন গড়ে উঠতে হলে বিশেষ করে মনুষ্যত্ব জ্ঞানে উজ্জ্বীবিত হতে হলে জ্ঞানঅর্জনের বিকল্প নেই। রাজা পূজিত হয় স্বদেশে। বিদ্যান পূজিত হয় সর্বত্র।

সাধারণ জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নৈতিক চরিত্র গঠনের শিক্ষাই হচ্ছে মৌলিক শিক্ষা। প্রাচীন কালে গুরু গৃহে এবং গুরু সান্নিধ্যে ব্যবহারিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। সুপ্রাচীন তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এবং প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ। পরবর্তীকালে বিশ্বখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিদ্যা শিক্ষার অন্যতম জ্ঞানতীর্থ। এ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের পর পূর্ববঙ্গের প্রান্তসীমায় প্রতিষ্ঠিত বন্দর নগরী চট্টগ্রামের অধুনা আনোয়ারা উপজেলাধীন দেয়াঙ পাহাড়স্থ ঝিউড়ি, বড় উঠান এলাকায় আবাসিক বিদ্যাপীঠ পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একমাত্র বিদ্যাচর্চার প্রাণকেন্দ্র। এ বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাল বংশের শিক্ষানুরাগী দ্বিতীয় স¤্রাট ধর্মপাল। এ বিদ্যাপীঠ সহ পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি বিদ্যাশিক্ষার কেন্দ্র বঙ্গদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা, ভাষা-সাহিত্য, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ও শিল্প-কলা’র উন্মেষে অসাধারণ অবদান বাখে, যা বিশ্বের ইতিহাসে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞ মনীষিগণ নিজস্ব মেধা ও মননশীলতা দিয়ে বাংলা ভাষার আদি গ্রন্থ চর্যাপদ বা চর্যাগীতি রচনা করে বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, বাংলা ভাষা স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে তা শুধু নয়, একুশের ভাষা দিবসটিও আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। আজ যে সব মহাপন্ডিত সিদ্ধাচার্যগণ প্রণীত চর্যাগীতিকে ভিত্তি করে বাংলা ভাষার গোড়া পত্তনে অক্ষয় কীর্তি রেখে গেছেন, তারা আজ প্রাত:স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন যুগ যুগ ধরে। এ ঐতিহাসিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়টি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও সেই গর্বিত ইতিহাস, ঐতিহ্য মাটি চাপা পড়লেও তার কীর্তিগাথা এখনো দেশে বিদেশে তথা যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। প্রতœতত্ববিদ ও ইতিহাস গবেষকগণ তাদের গবেষণার মূল্যবান উপাদান হিসাবে সেসব লিপিবদ্ধ করে গেছেন। বঙ্গদেশের গৌরবময় ইতিহাসে এর প্রমাণ মেলে।

অতীব আনন্দ ও গৌরবের বিষয় যে, আনোয়ারা দেয়াঙ পাহাড়ের সেই ঐতিহাসিক স্থানে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া দেশরতœ ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক প-িত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নতুনভাবে স্থাপনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর প্রতিশ্রুতি এবং বদান্যতায় বন্দর নগরী চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত আনোয়ারা উপজেলাধীন ঐতিহ্যমন্ডিত বড় উঠান তথা ঝিউরী এলাকায় তা গড়ে তোলার জন্য ইতোমধ্যে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বর্তমান লেখক ড. জিনবোধি ভিক্ষু  ২০১০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী হয়ে চীন সফরের সৌভাগ্য লাভ করেন। চীনের তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি জিন পিং মহোদয়ের সমীপে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অষ্টম শতকে গড়ে উঠা প-িত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব বর্তমান লেখক তুলে ধরলে তা পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য চীনের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য আশ্বস্ত করেন। দেশে ফিরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা পেয়ে ড. জিনবোধি ভিক্ষু আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চেয়ে ১৫ জুন ২০১১ ইং তারিখে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন পেশ করেন। আবেদন গৃহীত হয়। এতদসংক্রান্তে বিষয়াদি সাপেক্ষে আপনাদের অবগতির জন্য তা নি¤েœ তুলে ধরা হলো :

১। এ বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃপক্ষ গঠন করে দিয়েছেন এবং নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১২ নামে এর খসড়া আইন ১লা জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে সাবেক মাননীয় শিক্ষা নুরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সম্মানিত চেয়ারম্যান সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রতিনিধি বৃন্দের উপস্থিতিতে তা অনুমোদিত হয়।

২। অতীতে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়টি পুনঃরায় প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনায় উপরোক্ত কমিটির সম্মানিত কর্মকর্তা কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পরিদর্শন করত জমি নির্ধারণ করার সিন্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই আলোকে আপাতত পঞ্চাশ একর জমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে বরাদ্ধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে।

৪।  এ বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের  জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিনিধি দল বৌদ্ধদেশ শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন সহ নীতিমালা সংগ্রহ পূর্বক নীতিমালা লিপিবদ্ধ করে সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।

৫। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ৫৬০ কোটি টাকার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

৬। এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে বিগত ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫ইং তারিখ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাইল পাঠানো হয়েছে। ইতিহাসখ্যাত এবং ঐতিহ্যমন্ডিত আনোয়ারাবাসী তথা সকলের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামে যে একটি পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি পুনরায় প্রতিষ্ঠাকল্পে চীন সরকারের সহায়তার হাত বাড়ানোর আকুতিও চীনা প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রকাশ করা হয়। চীনা প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মতিও জানান আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে। বাংলাদেশের শিল্প বাণিজ্য, অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে চীন বরাবরই যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে, পররাষ্ট্র বিষয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান। শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়েও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী এই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সর্ম্পক জোরদার করার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন যে আরো দৃঢ় হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে দক্ষ জনগোষ্ঠি গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের সহায়তা ও নিজেদের সামর্থে আন্তর্জাতিক মানের এ রকম একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ্রহে চট্টগ্রামের দেয়াঙ অঞ্চলে পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার কাজ শুরু করার নির্দেশ প্রদান করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উল্লেখ্য যে,  ড. জিনবোধি বাংলাদেশ ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সম্মতি, আন্তরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চেয়ে বিগত ১৫ জুন ২০১১ খ্রি. তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাবরে আবেদন পত্র পেশ করেন। ঐ আবেদন পত্রে আবেদনের বিষয়টি সহানুভুতির সাথে বিবেচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট লিখিত সুপারিশ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী) বীর বাহাদুর উশেসিং প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ২০১১, ৪ আগস্ট তারিখে মতামত চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়কে পত্র দেওয়া হয়। ২০১১, ৫ অক্টোবর তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বাক্ষরিত পত্র মাধ্যমে সরেজমিনে পরিদর্শন পূর্বক মতামত প্রদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে অনুরোধ জানান। ইউজিসি কর্তৃক গত ২০১১, ২০ নভেম্বর তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কর্মকর্তাগণ হলেন আহবায়ক, প্রফেসর ড. আতাফুল হাই শিবলী, সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এবং জনাব ফেরদৌস জামান, উপ-সচিব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য স্থান নির্বাচন চেয়ে ড. জিনবোধি কর্তৃক আবেদনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০১৩, ০৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে স্থান নির্বাচনের জন্য আবেদন করেন। ইউজিসির পত্রে উল্লেখিত সম্ভাব্য স্থান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ড. মোহব্বত খান, প্রফেসর ড. আবুল হাসেম, জনাব ফেরদৌস জামান, উপ-সচিব, আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা,স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিশেষ প্রতিনিধি ও আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বাহাউদ্দিন খালেদ শাহজী প্রমুখ সহকারে ২০১৩, ১৪ ফেব্রুয়ারি পরিদর্শন সম্পন্ন করেন। তারা চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলাধীন বটতলী মৌজার বি.এস. খতিয়ান নং- ০১, ৪০২, ১০৭৭, ১৩২১, ১৫০১, ১৫০৩, ১৬০৭, ১৮২৩, ২৪৫৪ এর বিএস দাগ নংÑ ৫০০১, ৫০০৩, ৫০০৪, ৫০০৫, ৫০০৬, ৫০০৭, ৫০০৮, ৫০০৯, ৫০১০, ৫০১২, ৫০১৭, ৫০১৮, ৫০১৯, ৫১৪২, ৫১৪৩, ৫১৪৪, ৫১৪৫, ৫১৪৬, ৫১৪৭, ৫১৪৮, ৫১৪৯, ৫১৫০, ৫১৫১ এর পূর্ণঅংশ ও ৫০১৬ দাগের আংশিক মোট ৫০.০০ একর (কম/বেশি) বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসাবে নির্বাচন করার মত প্রদান করেন। সেই মতে ভূমি হুকুম দখল শাখা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, চট্টগ্রাম সরেজমিনে পরিদর্শনকৃত ও নির্বাচিত তফসিলভূক্তি দাগসূচি, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি সম্বলিত সিডিউল, উক্ত জমির সম্ভাব্য খসড়া মূল্য/প্রাক্কলন, লাল কালি দ্বারা পরিচিহ্নিত ভূমির ট্রেস ম্যাপ ২০১৩, ০৩ মার্চ তারিখে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবরে পেশ করেন। অত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের যে খসড়া ইউ.জি.সি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেয় তা নিয়ে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করে ২০১৩, ০১ জানুয়ারি তারিখে শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিবর্গের উপস্থিতি এবং মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত আইন ২০১২ ইং নামে অনুমোদন করা হয়। বলা হয়, এই আইন আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় ২০১২ নামে অভিহিত হইবে। ৬০টি ধারা ও ২৫ সংবিধি সম্বলিত এই আইন প্রণীত ও অনুমোদিত হওয়ার পর দেশের মানুষের, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগ ও চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে আশা জাগে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের হাতেই এই বিশ্ববিদ্যালয় শীঘ্রই প্রতিষ্ঠা পাবে। এতদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তরগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে মত বিনিময়, চিঠি চালাচালি হতে থাকে।

সরকারি কর্মকর্তারা বৌদ্ধধর্ম প্রধান রাষ্ট্রগুলোর দূতাবাসের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ঐসব দেশের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে নানা পরামর্শ সভা করেন, যাতে শিগগির বিশ্ববিদ্যালয়টির কাজ শুরু করা যায়। এদিকে ২০১৩, ০৬ জানুয়ারি তারিখে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নির্দেশ মোতাবেক ৫০ একর সরকারি খাস জমি বরাদ্দের জন্য যাবতীয় রিপোর্ট চট্টগ্রামের সম্মানিত জেলা প্রশাসক মহোদয়ের মাধ্যমে ২০১৩, ০৩ মার্চ তারিখে ইউ.জি.সির মাননীয় চেয়ারম্যান ও শিক্ষা সচিব বরাবরে প্রতিবেদন পেশ করা হলে, সরকারি খাস ও কৃষি জমিতে সরকারিভাবে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিধায় এ লক্ষ্যে ২০১৩, ০৮ এপ্রিল তারিখে এর প্রতিষ্ঠায় আনুমানিকভাবে ব্যয় ধার্য্য করা হয় ৫ শ’ ৬০ কোটি টাকা। ইতোপূর্বে ২০১৩, ২৪ মার্চ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বৈদেশিক সাহায্যের ব্যাপারে পিডিপিপি তৈরি করে ব্যয় বাবদ ৫ শ’ ৬০ কোটি টাকা (সমুদয় প্রকল্প সাহায্য) প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৩ থেকে জুন ২০১৮ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। যেহেতু, পিডিপিপিতে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলংকা সরকারের অনুদান সহায়তার প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তাই ২০১৩, ০৮ এপ্রিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সংশ্লেষে প্রতিফলন করা সম্ভব নয় বলে জানায়। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা কল্পে ইউ.জি.সির প্রতিনিধিগণ অনুদান সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বের চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের হাইকমিশনার/দূতাবাস কর্মকর্তাদের সাথে নানাভাবে যোগাযোগ করলে তারা জানায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে সহায়তার ব্যাপারে তাদের সরকারের সাথে আলোচনান্তে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় এর বিষয়ে সার্বিক অগ্রগতি প্রতিবেদনে ইউজিসি কথাগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। এমতাবস্থায়, আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি স্বতন্ত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে কিনা সে বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন জানিয়ে শিক্ষা  মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করে।

পরিস্থিতিদৃষ্টে ড. জিনবোধি ভিক্ষু মহোদয় আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় সরকারিভাবে এবং সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠার  জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত কামনা করে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ২০১৫, ২২ জুলাই আন্তর্জাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় সরকারিভাবে এবং সরকারী অর্থায়নে প্রতিষ্ঠার জন্য সার্বিক অগ্রগতি চেয়ে সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তৃক ২০১৫, ২১ শে ডিসেম্বর তারিখে মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রদত্ত প্রতিবেদনে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে কিনা, সে বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রতিবেদন পেশ করলেও এ বিষয়ে কোন সুরাহা না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা পোষণকারী জনগোষ্ঠি খুব ব্যথাহত হয়। তৎকালীন সময়ের জাতীয়, স্থানীয় নানা দৈনিক, মাসিক পত্র, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত, প্রচারিত লেখায় সেই বেদনা ভাষ্য ছড়িয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও আশা পোষণকারী জনগোষ্ঠি আশা পোষণ করে যে, যেহেতু দক্ষ জনগোষ্ঠি সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষার বিস্তারে জননেত্রী শেখ হাসিনা খুবই আন্তরিক, জাতির স্বপ্ন পূরণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, উপরন্ত, বাংলার গৌরবময় অক্ষয়কীর্তির ইতিহাস বিজড়িত এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস তাঁর রয়েছে, তাই তাঁর হাতেই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পাবে। এটি নিশ্চিত যে, অত্র বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সকল দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগসূত্র স্থাপিত হবে, দেশের ভাবমূতি শতধারায় প্রস্ফুটিত হবে। এ ব্যাপারে অত্র বিশ^বিদ্যালয় বাস্তবায়নে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া দেশরতœ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

—————————————————

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, পালি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।