আইন অঙ্গনে একটি অসাম্প্রদায়িক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন

105

||কাজল দেবনাথ||

করোনায় আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে রোববার সন্ধ্যায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশের এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সদা হাসিমুখের এই মানুষটির এমন বিদায় কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে করোনাভাইরাস পজেটিভ রিপোর্ট আসে। কিন্তু তিনি এটাকে তেমন আমলেই নিতে চাইছিলেন না। নিকটজনকে বলতে শুনেছি, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। একটু জ্বর ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা নেই। গলায় একটু ব্যথা আছে তবে কোনো চিন্তা করবেন না। ভালো হয়ে যাবো। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এমন প্রাণোচ্ছ্বল মানুষটির অবস্থার অবনতি ঘটলে ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়া হয়। পরবর্তীতে লাইফ সাপোর্টে। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে এর আগে আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, সর্বশেষ করোনাভাইরাস রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এটাকেই ভরসা করে নিকটজনদের সাথে আমরা সবাই সান্ত¦না দিচ্ছিলাম এই বলে Ñ নিশ্চয়ই অমাবশ্যার এই ঘোর অন্ধকার কাটিয়ে উঠবেন আমাদের মাহবুব ভাই।

শনিবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের আশু রোগমুক্তি কামনা করে প্রার্থনা করেন তাঁর আপনজনেরা। কিন্তু সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন।

খুব কাছে থেকে দেখা এই মানুষটি একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলা, যুদ্ধাপরাধী মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ মামলা, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীসহ বহু ঐতিহাসিক মামলায় রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানি করেছেন, তেমনই মানবাধিকার বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ন্যায্য অধিকারের বিষয়ে তিনি ছিলেন সর্বদা উচ্চকন্ঠ। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হয়েও বহুবার দেখেছি আদালতে দাঁড়িয়ে বলতে, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পক্ষে, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের পক্ষে ন্যায্য কথাটি বলতে দাঁড়িয়েছিÑ মি লর্ড।’ এবং এই মানুষটিই ছিলেন সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশের এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, যিনি ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি হতে আমৃত্যু ঐ পদে আসীন ছিলেন।

মনে প্রাণে বাঙালি, অসাম্প্রদায়িক এবং সর্বোপরি একজন ভালো মানুষকে হারালো বাংলাদেশ, অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হারালো আইন অঙ্গনে তাদের একান্ত আপনজন, শুভাকাক্সক্ষী, যিনি ছাতার মতো সর্বদা আগলে রাখতেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে। এ ক্ষতি পূরণ হবার নয়।