অনুসন্ধানী সাংবাদিক সচিবালয়ে আটক ও হেনস্থা, মামলার পর কারাগারে

7

ডেস্ক রিপোর্ট।। দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, যিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে ইতোমধ্যে খ্যাতি কুড়িয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন, সেই রোজিনা ইসলাম সোমবার (১৭ মে) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পেশাগত কাজে গেলে আমলাদের হেনস্থার শিকার হন। তাঁকে পাঁচ ঘন্টারও বেশি সময় মন্ত্রণালয়ে আটকে রেখে নিগ্রহ করা হয়, এক সময় অসুস্থও হয়ে পড়েন তিনি। নিগ্রহের কারণে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার ছবি ভাইরাল হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার নাম করে রোজিনা ইসলামকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের গোপন নথি সংগ্রহ ও বিভিন্ন নথির ছবি তোলার অভিযোগ এনে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে’ মামলা দায়ের করা হয়েছে।

খবর পেয়ে রাতেই থানায় ছুটে যান সাংবাদিকরা, সহকর্মীর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ দেখান। সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা প্রতিবাদ জানান, সরকারকে ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে রাতেই ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’, নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিজম’ দ্রুত রোজিনার মুক্তি দাবি করে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ না করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।

প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ জানান, ‘রোজিনা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু আলোচিত প্রতিবেদন করেছেন। ধারণা করছি, এসব প্রতিবেদনের কারণে রোজিনা কারও কারও আক্রোশের শিকার হয়েছেন।’ উল্লেখ্য রোজিনা কানাডিয়ান অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সিলেন্স ইন বাংলাদেশি জার্নালিজম, জার্মানিভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার পেয়েছেন।

রোজিনা ইসলামকে মঙ্গলবার সকালে আদালতে তোলা হয় এবং পুলিশের পক্ষ থেকে রিমান্ড চাওয়া হয়। অন্যদিকে রোজিনার আইনজীবীরা তাঁর জামিন আবেদন পেশ করেন। মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। জামিন শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ২০ মে। আজ দিনভর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে রোজিনার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। সাংবাদিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রোজিনার মুক্তি না মেলা পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবের ব্রিফিং তারা বর্জন করবেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোজিনার মুক্তির পদক্ষেপ দাবি করেন।

বিকেলের দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দাবি করেন রোজিনা ইসলাম করোনাভাইরাসের টিকা সম্পর্কে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তির নথিপত্র নেবার চেষ্টা করছিলেন।

এদিকে রোজিনা ইসলামকে হেনস্থা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের ১১ বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁরা রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রোজিনা ইসলামের আক্রান্ত হওয়ার কারণ তলিয়ে দেখা ও হামলাকারীদের চিহ্নিত করে তাদের কর্মকান্ডের তদন্ত করার দাবি জানান।

আজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা এ দাবি জানান। বিবৃতিদাতারা হলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, সারোয়ার আলী, মফিদুল হক, মামুনুর রশীদ, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবীর, আবদুস সেলিম ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তাঁরা বলেন, আমরা মনে করি, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাঁর মুক্তিলাভে সরকার বিবেচকের ভূমিকা পালন করবেন। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা, সরকারের ঘোষিত এই দুই নীতির সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য সংগ্রহকালে যেভাবে কর্মকর্তাদের দ্বারা হেনস্থা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য অপহরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, তা আমাদের বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। বর্তমান করোনা দুর্যোগকালে সংকট মোকাবিলায় সরকার ও জনগণের যে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস পরিচালিত হচ্ছে, তা সর্বতোভাবে জোরদার করার লক্ষ্যে আমরা সবাই সমবেত রয়েছি। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যকর্মীরা গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছেন। একই সাথে মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সরকারও বিভিন্ন সময় বিব্রত হয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে রোজিনা ইসলামসহ অন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সহযোগিতা দ্বারা সরকার উপকৃত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম আক্রান্ত হওয়ার কার্যকারণ আরও তলিয়ে দেখা ও হামলাকারীদের চিহ্নিত করে তাদের কর্মকান্ডের তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছি।