বাংলার গান গাইঃ অজয় দাশগুপ্ত।

33

সি আর দত্ত-চিত্তরঞ্জন দত্ত স্বদেশে ফিরলেন, ফিরলেন নিজের প্রিয়জনদের কাছে নিজের ঘরে। সাহসী মানুষ ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অসম সাহস দেখালেন। পাকিস্তানি বর্বর হানাদারদের নিষ্ঠুর হামলায় বিপর্যস্ত ইপিআরবাহিনীকে বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর বাহিনী হিসেবেপুনর্গঠনের সময় সাহস দেখালেন। বাংলাদেশের তিন পাশে ভারত। চোরাচালানের সমস্যা আছে। অবাধে মানুষ চলাচলের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে তখন খাদ্য ঘাটতি প্রকট। চাল-গম-ডাল-মশলা-মাছ-মাংস যতটা উৎপাদন হয়, চাহিদা তার তুলনায় ঢের বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সদ্যজাত বাংলাদেশে নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল‘শূন্য’। তাহলে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি হবে কীভাবে? মুক্তিযুদ্ধকালীন বড় বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষী ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করলেন। চাল-গম দিলেন অনুদান হিসেবে। এক কোটির মতো শরণার্থী যাতেপাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত স্বদেশে ফিরে আসতে পারে সে জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করলেন। সীমান্তে নবগঠিত বিডিআর বাহিনী তাদের সব ধরনের সহায়তা দিল। কিন্তু কুৎসা রটনা শুরু হলো, অপপ্রচার চলতে থাকল ‘হিন্দু সি আর দত্তের’ নেতৃত্বে বিডিআর বাহিনী বাংলাদেশের সব কিছু ভারতে পাচার করে দিচ্ছে এ কারণেইবাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য মিলছে না।
সিআর দত্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেক্টর কমান্ডার। বীরউত্তম খেতাব পেয়েছেন রণাঙ্গনে অসমসাহসে সামনের সারিতে থেকে লড়ার জন্য। কিন্তু তাকেই দিনের পর দিন বদনাম দেওয়া হয়েছে। দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। তিনি তা উপেক্ষা করেছেন। দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংকল্পবদ্ধ থাকার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। বলেছেন পাকিস্তানি সা¤প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে চললে ফের দুর্যোগ নেমে আসবে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সা¤প্রদায়িক প্রচারণা নতুন মাত্রা পায়। দেশে যত সমস্যা রয়েছে, তার জন্য দায়ী করা হতে থাকে ভারতকে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা জবরদখল করে হুঙ্কার ছাড়েন, ‘ভারতের হাত থেকে প্রতি ইঞ্চি জমি রক্ষার জন্য আমরা প্র¯‘ত’। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে অসা¤প্রদায়িক আদর্শ বিদায় করে দেন। এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় এসে ভোট ডাকাতির জাতীয় সংসদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন।এদের আমলে চোরাচালান কমেনি, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি, সমুদ্রসীমা প্রসারিত করা যায়নি, সীমান্ত চুক্তি বলবৎ হয়নি। বাস্তবে তারা এ সমস্যার সমাধান চায়নি। তারা চলতে চেয়েছে সেই পাকিস্তানি দুঃসময়ের মতো। সি আর দত্ত এই কঠিন সময়েই সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বার্থ, বারবার রুখে দাঁড়ালেন অসম সাহসে। এমনকি ঘনিষ্ঠজনেরাও শঙ্কিত রাষ্ট্রধর্ম সেনসেটিভ ইস্যু, নিরব থাকাই ভাল। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েএগিয়ে গেলেন। গড়ে তুললেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সঙ্গে পেলেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অনেক মানুষ, নানা ধর্মের অনুসারী তারা। সাহস করে তিনি বলেন ধর্মীয় রাষ্ট্র করার জন্য একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করি নাই। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার চিরকালীন এ সত্য প্রতিটি সভায়, ঘরোয়া আলোচনায়, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ধ্বনিত হতে থাকল তাঁর কণ্ঠে। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করলেন সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে। সি আর দত্তের নিরলস প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য এর চেয়ে ভাল আয়োজন আর কী-ই বা হতে পারে।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় কুখ্যাত ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ জারি হয়। ৫৫ বছর ধরে এ কালো আইনের কারণে কত পরিবার ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে, তা গুণে শেষ করা যাবে না। সি আর দত্ত হার মানতে চাননি। অব্যাহতভাবে দাবি করে গিয়েছেনÑশত্রæ সম্পত্তি আইন বা তার পরিবর্তিত রূপ অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল করতে হবে। অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া সম্পত্তি রাষ্ট্রকে বৈধ উত্তরাধিকারদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি বারবার বলেছেন বাংলাদেশের কোনো নাগরিক দশকের পর দশক ইউরোপ-আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে থাকলে যদি তার সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি না হয়, তাহলে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় সেপ্টেম্বর মাসের কয়েকটি দিন কেউ ভারতে থাকলে তার সম্পত্তি কেন ‘শত্রু’ সম্পত্তি’ হিসেবে গণ্য হবে ? আর কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তিই বা কেন এ আইনের আওতায় আসবে ? এর পেছনে কাজ করেছে সা¤প্রদায়িক মনোভাব, সে যুক্তি তিনি বারবার দিয়েছেন। কেউ কান দিয়েছে। কেউ দেয় নাই। কিš‘ সিআর দত্ত ন্যায়ের জন্য আমৃত্যু লড়ে গেছেন।
যখন তাঁর নিরব, নি®প্রাণ দেহ ফিরে এলো প্রিয় স্বদেশে,তখন এ বেদনাবোধ জাগতেই পারে কেন এমন করে বারবার তাঁকে অপবাদ সহ্য করতে হয়েছে ? কেনই বা এমন কি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত অনেকেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ যেন পরিচালিত হয়, তার স্বপক্ষে সময়য়োচিত বলিষ্ঠ অবস্থান দিতে পারেননি ?
তিনি বাংলার গান গেয়েছেন আজীবন। ৯৩ বছরে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। পরিণত বয়স বলতেই পারি। তবে তাকে যদি আরও অনেকদিন পাওয়া যেত, এমন অতৃপ্তি-বেদনা থাকবেই। সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতির জন্য যারা কাজ করেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ যারা অনুসরণ করেন, তাদের মধ্যে বিশেষভাবে তরুণ-যুবক-যুবতী যারা, তারা প্রধান অভিভাবককে হারালেন। রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক অঙ্গনে তাঁর বয়সী আর কেউ এভাবে সক্রিয় ছিলেন না। কিন্তু‘ সবার সঙ্গে কাজ করতে, এমনকি পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনী বয়সের সকলকেও সহকর্মীর আসনে বসিয়ে, যথাযথ মর্যাদা দিয়ে কাজ করতে তাঁর কোনো সময়েই সমস্যা হয়নি। এ এক বিরল গুণ বৈকি।
বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা মাতৃভূমির শ্রেষ্ঠ সন্তান সিআর দত্ত, আপনার প্রতি।